১০৫তম জন্মবার্ষিকী

চোরাই ক্যামেরা ঘষা লেন্স সত্যজিতের দুর্লভ মুহূর্ত

আপডেট : ১৬ মে ২০২৬, ০৮:২৯ পিএম

‘তিনকন্যা’ সিনেমার মণিহারা পর্বের শুটিং চলছে। এরিফ্ল্যাক্সের ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে শক্ত হাতে ক্যামেরার হাতল ধরে নায়িকা কণিকা মজুমদারের মনোময় দৃশ্য ধারণ করছিলেন সত্যজিৎ রায়। তার চিরচেনা এই অভিনিবেশের কয়েকটা এক্সট্রিম ক্লোজআপ তুললেন আলোকচিত্রশিল্পী আমানুল হক। শুটিং শেষে বাসায় ফিরে ঢুকলেন ডার্করুমে। ফিল্ম ডেভেলপ করে নেগেটিভের শার্পনেস দেখে আমানুলের চোখ বিস্ময়ে ছানাভরা। কলকাতার চোরাই মার্কেট থেকে কেনা পুরনো ক্যামেরা আর ঘষা লেন্সে এত শার্প ছবি উঠবে, তা ছিল তার কল্পনারও অতীত। তিনি ছবিটার একটা বড় প্রিন্ট করলেন। পরের দিন গিয়ে হাজির হলেন সত্যজিতের ৩ নম্বর লেক টেম্পল রোডের বাড়িতে। অধীর উত্তেজনা নিয়ে ছবিটি তুলে দিলেন তার গুরুর হাতে।

নিজের ছবির বিষয়ে খুব একটা আগ্রহ ছিল না সত্যজিতের। বাড়ির দেয়ালে নিজের ছবি টাঙাতেও চাইতেন না। কিন্তু এই ছবিটি দেখে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন সত্যজিৎ। তার চোখে-মুখে আনন্দ। শোবার ঘরের দিকে যেতে যেতে স্ত্রী বিজয়া রায়কে ডাকলেন। উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বললেন, ‘মঙ্কু দেখো, আমানুল তুলেছে!’ ফিরে এসে আমানুলকে বললেন, ‘আমার সেকেন্ড বেস্ট পোর্ট্রেট!’ আমানুল সঙ্গে সঙ্গে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তাহলে আপনার বেস্ট পোর্ট্রেট কোনটি?’ সত্যজিৎ বললেন, ‘এক ফরাসি ফটোগ্রাফারের তোলা। এই মুহূর্তে ছবিটি আমার হাতে নেই। পরে তোমাকে দেখাব।’ বহুদিন পর সত্যজিৎ নিজে থেকেই ছবিটি আমানুলকে দেখিয়েছিলেন। ছবিটি ম্যাগনামের বিখ্যাত ফটোগ্রাফার মার্ক রিবুর তোলা। ১৯৫৬ সালে কলকাতায় ‘অপরাজিতা’ সিনেমার শুটিং চলাকালে ছবিটি তুলেছিলেন রিবু।

সত্যজিৎ রায়ের সেকেন্ড বেস্ট পোর্ট্রেট [কলকাতা, ১৯৬১]। আলোকচিত্র : আমানুল হক

১৯৬১ সালে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের মুখপত্র ও বিশ্ববিখ্যাত সিনেমাবিষয়ক সাময়িকী সাইট অ্যান্ড সাউন্ড-এ ‘সত্যজিৎ রায় : এ স্ট্যাডি’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেন এরিক রোড নামের এক জাঁদরেল চলচ্চিত্র সমালোচক। সেই প্রবন্ধের [গ্রীষ্ম সংখ্যা, ১৯৬১, ভলিউম : ৩০, পৃষ্ঠা : ১৩২-১৩৬] শুরুতে মূল ছবি হিসেবে আমানুলের তোলা সত্যজিতের সেকেন্ড বেস্ট পোর্ট্রেটটি ছাপা হয়। এই ছবির সম্মানী হিসেবে আমানুল বেশ কিছু ডলার পেয়েছিলেন। ব্রিটিশ ব্যাংক থেকে পাঠানো চেকটি ভাঙাতে কলকাতায় তার বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। ওই টাকা আমানুলের আধা বেকার জীবনে কিছুদিনের জন্য হলেও সচ্ছলতা ফিরিয়ে দিয়েছিল। আমানুল হক রচিত প্রসঙ্গ সত্যজিৎ বইয়ের ৫১ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘দেখো আমানুল তুলেছে! আমার সেকেন্ড বেস্ট পোর্ট্রেট’ শিরোনামের প্রবন্ধে ঘটনাটির বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।

সত্যজিতের সঙ্গে আমানুলের পরিচয় ১৯৫৯ সালে। সত্যজিৎ তখন ‘দেবী’ সিনেমার স্ক্রিপ্ট রচনা করছিলেন। এক রবিবার সকালে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমানুল গিয়ে হাজির হন সত্যজিতের বাড়িতে। যাওয়ার আগে কলকাতার চোরাই মার্কেটের মাটিতে বসা এক বিক্রেতার কাছ থেকে ৭০ টাকায় কিনলেন পুরনো একটা ক্যামেরা। ঘষা লেগে লেগে লেন্সের মাঝের অংশ প্রায় অস্বচ্ছ হয়ে গেছে। লেন্সের ভেতর ফাঙ্গাসের দঙ্গল। ক্যামেরাটি মেরামত করে তাতে সাদাকালো আগফা ফিল্ম ভরে গেলেন সত্যজিতের বাসায়। সেদিন আমানুল তার ‘অলস মধ্যাহ্ন’ শিরোনামের ছবিটি সত্যজিৎকে উপহার দেন। সত্যজিৎ সেই ছবিটিকে বিশ্বসেরা ফরাসি আলোকচিত্রী হেনরি কার্তিয়ের ব্রেসোঁর মানবিক সংবেদনশীল আলোকচিত্রের সঙ্গে তুলনা করেন।

সত্যজিৎ রায়ের পাশে দুই দরিদ্র শিশু [বোড়াল, কলকাতা, ১৯৬১]। আলোকচিত্র : আমানুল হক

এর কয়েক মাস পর সত্যজিৎ আমানুলকে বললেন, ‘একদিন আমার বাসায় এসো। তোমাকে একটি ছবি দেখাব।’ আমানুল বললেন, ‘মুভি না স্টিল?’ সত্যজিৎ বললেন, ‘স্টিল।’ মেঘগম্ভীর কণ্ঠটা একটু নিচে নামিয়ে বললেন, ‘এমন একজন ফটোগ্রাফারের ছবি দেখাব, যার মতো পৃথিবীতে কেউ জন্মায়নি; কোনোদিন জন্মাবেও না—হেনরি কার্তিয়ের ব্রেসোঁ!.. তুমি আমাকে যে ছবিটি দিয়েছিলে, ঠিক ওই রকম।’ ব্রেসোঁর ছবি দেখিয়ে সত্যজিৎ বললেন, ‘ব্রেসোঁ আমাকে খুব স্নেহ করেন।’

সত্যজিতের কত না ছবি তুলেছেন আমানুল। কত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রকাশনায় ছাপা হয়েছে সেসব ছবি। অনেকেই মনে করেন সত্যজিতের ছবিগুলো দামিক্যামেরা আর আধুনিক লেন্সে তোলা। কিন্তু আমানুল তার প্রবন্ধে লিখেছেন, সত্যজিতের প্রায় সব ছবিই এই চোরাই ক্যামেরায় তোলা। এমন নড়বড়ে ক্যামেরা আর ঘষা লেন্সে কেমন করে এত ভালো ছবি তোলেন—আমানুলকে একাধিকবার এমন প্রশ্ন করেছিলেন সত্যজিৎ। শৈল্পিক দক্ষতার পাশাপাশি সত্যজিতের প্রতি তার অপরিসীম ভক্তিই হয়তো তাকে এমন শিল্পকর্ম সৃষ্টিতে প্রাণিত করেছে।

‘পথের পাঁচালী’ সিনেমার শুটিং হয়েছিল বোড়াল গ্রামে; সেই গ্রামেই ১৯৬১ সালে ‘তিনকন্যা’ ও ‘পোস্টমাস্টার’ চলচ্চিত্রের কিছু শুটিং হয়। ‘পোস্টমাস্টার’ সিনেমার শুটিংয়ের সময় ওই গ্রামের দুটি কৌতূহলী দরিদ্র শিশু সত্যজিতের কাছে এসে রোজ দাঁড়িয়ে থাকত। কালো গায়ের ন্যাংটা ছেলেটির বয়স তিন-চার বছর। আর তার বড় বোনটির বয়স সাত-আটের বেশি হবে না। জল লতার মতো বাড়ন্ত, কালো চেহারা আর মায়াভরা চোখ। হাতে বালা, কানে দুল; বড় গামছার মাপের এক খণ্ড ছেঁড়া ও মলিন কাপড় কোমরে প্যাঁচানো। সত্যজিতের মতো এত বড় মানুষের সান্নিধ্যে ন্যাংটা-বামন-কৃষ্ণকায় শিশু আর খালি গায়ের কিশোরীর উপস্থিতি ছবির বিষয়বস্তু হিসেবে আমানুলের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ কন্ট্রাস্ট। সত্যজিতের এই ছবিটাকেই নিজের তোলা শ্রেষ্ঠ ছবি মনে করতেন আমানুল।

সুপ্রভা রায়, বিজয়া রায় ও সন্দীপ রায়ের সঙ্গে সত্যজিৎ রায় [লেক টেম্পল রোড, কলকাতা, ১৯৫৯]। আলোকচিত্র : আমানুল হক

১৯৮২ সালে সাইট অ্যান্ড সাউন্ড সাময়িকীটি তাদের পঞ্চাশ বছরপূর্তি উপলক্ষে [শরৎ সংখ্যা, ভলিউম : ৫১, পৃষ্ঠা : ২৬৮-২৭৪] ‘আন্ডার ওয়েস্ট্রার্ন আইজ : সত্যজিৎ রায়’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশ করে। ওই প্রবন্ধের ২৭২ নম্বর পৃষ্ঠায় আমানুলের তোলা বোড়াল গ্রামের দুই ভাইবোনের ছবিটিও ছাপা হয়। এই খবরটি আমানুলকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন সত্যজিৎ। দীর্ঘ দিন পরদক্ষিণ কলকাতার ১/১ বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়িতে গেলে সত্যজিৎ নিজেই সেই বিশেষ সংখ্যাটি আমানুলের হাতে তুলে দেন। সত্যজিতের মৃত্যুর পর ২০০১ সালের জানুয়ারি মাসে নতুন দিল্লির রোলি বুকস থেকে প্রকাশিত  বিজয়া রায় রিমেম্বার্স : সত্যজিৎ রায় এট ওয়ার্ক বইয়ের প্রচ্ছদেও এই ছবিটি ছাপা হয়।

সত্যজিতের একটি ছবিকে খুবই রহস্যময় মনে হয়। দুই হাত মেলে দিয়ে দানবীয় ভঙিতে দাঁড়িয়ে আছে এক মানব শরীর। পেছন থেকে তোলা। চেহারা দেখা যায় না। রবীন্দ্রনাথের প্রামাণ্যচিত্র ‘বাল্মিকী-প্রতিভা’ নৃত্যনাট্যের দৃশ্য এটি। নির্দেশনায় সত্যজিৎ। এই ছবি নিয়ে কামরার প্রথম খণ্ডে [প্রকাশকাল : জানুয়ারি ২০১২] একটি চমৎকার রিভিউ লিখেছেন আলোকচিত্রী ও কিউরেটর তানজিম ওয়াহাব। ১৪৭ নম্বর পৃষ্ঠায় তানজিম লিখেছেন, ‘ছয় ফুট সাড়ে চার ইঞ্চির এই দেহখানা অকস্মাৎ হাত মেলে ধরল। যেন অর্কেস্ট্রা সংগীতের গোটা নিয়ন্ত্রণই তার হাতে। ব্রেসোঁর ডিসাইসিভ মোমেন্ট চিনতে ভুল করেনি আমানুল। আমানুল এক্সপোজার দিলেন। ফ্লাশ না জ্বালিয়ে উপস্থিত আলোর শৈল্পিক ব্যবহার হল। উপরে প্যাঁচানো গাছের ডাল আর সত্যজিতের শরীর যেন সিলুয়েটের কালো রহস্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছবিতে কালোর অংশই বেশি। আমানুলের শৈলীর পরিচিত রূপ। স্যুরিয়েল আবহে বনে বাদাড়ে ঐশ্বরিক এক আলো। বাম পাশে নর্তকীর পিঠ ঘেঁষে আলোর এক বিষ্ফোরণ ঘটল। দূরে আবছাভাবে দেখা যাচ্ছে বল্লম হাতে দাঁড়ানো কিছু শরীর।’

বাল্মিকী প্রতিভার নির্দেশনায় সত্যজিৎ রায় [কলকাতা, ১৯৬১]। আলোকচিত্র : আমানুল হক

সত্যজিতের পরিবারের এমন একটি দুর্লভ ছবি তুলেছেন আমানুল, যা অন্য কোনো আলোকচিত্রীর পক্ষে তোলা সম্ভব হয়নি। ১৯৫৯ সালের কোনো এক দিন আমানুল সত্যজিতের বাড়িতে গিয়ে দেখেন বাসার ড্রয়িংরুমে সোফার ওপর বসে আছেন বিজয়া রায়। পাশের সোফায় সত্যজিতের মা সুপ্রভা রায়। পেছনের চেয়ারে সত্যজিৎ। তার কোলে সন্দীপ। সন্দীপের বয়স ছয় কী সাত। হাফ প্যান্ট আর কালো গেঞ্জি পরা। বাবার কোলে বসে সে গল্প করছে ঠাকুরমার সঙ্গে। রায় পরিবারের চারজনকে এক ফ্রেমে পাওয়ার মুহূর্তকে আমানুলের কাছে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ মনে হলো। ফলে অনুমতির তোয়াক্কা না করেই ছবি তুলতে শুরু করলেন তিনি। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ সত্যজিৎ তার বাঁ-হাতটা থুতনির ওপর রাখলেন। আর তখনই আমানুল পেয়ে গেলেন তার প্রত্যাশিত ছবি। সত্যজিতের প্রয়াণের পর ১৯৯২ সালের ২৮ মার্চ ভারতের জনপ্রিয় সাময়িকী দেশ ছেপেছিল ছবিটা।

শুটিং স্পট থেকে বাড়ির অন্দরমহল—কোথাও ছবি তুলতে অনুমতি লাগত না আমানুলের। আমাদের কথা বইয়ের সেসব কথা লিখেছেন বিজয়া রায়। ২২৫ নম্বর পৃষ্ঠায় বিজয়া রায় লিখেছেন, ‘১৯৫৯ সালে যখন আমরা এবাড়িতে এলাম, তখন আমানুল হক বলে বাংলাদেশি একটি ছেলে আমাদের বাড়িতে উপস্থিত হয়। সে ফটোগ্রাফার এবং তার মতে মানিকের [সত্যজিৎ রায়ের ডাকনাম] মতো সাবজেক্ট খুঁজে পাওয়া মুশকিল বলে মানিকের ছবি তোলার অনুমতি চাইল। ছেলেটির কথাবার্তা ভারী সুন্দর এবং অত্যন্ত অমায়িক। দেখেশুনে আমাদের ভালোই লাগল এবং মানিক সহজেই অনুমতি দিলেন। আমার শাশুড়িকেও সে প্রণাম করল। কিছুদিনের মধ্যে আমাদের বাড়ির লোকের মতো হয়ে গিয়েছিল ছেলেটি। ওকে মানিকের খুব পছন্দ হয়েছিল। সত্যি চমৎকার ছবি তোলে এবং এখনো কলকাতায় এসেই আমাদের সঙ্গে দেখা করে। ছবিও তোলে। আমার বউমা এবং নাতির বহু ছবি ও তুলেছে। আমাদের চারজনের ছবি একমাত্র ও ছাড়া আর কেউ তোলেনি। আমি, আমার শাশুড়ি, মানিক ও বাবু [সন্দীপ রায়]। বাবু অবশ্য তখন খুবই ছোট, সেও আমানুলের সঙ্গী হয়ে পড়ল।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত