নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচারে সাজা হয় মাত্র ৩ শতাংশ মামলায়। এ ছাড়া ৭০ শতাংশ মামলায় আসামি খালাস পান। এক গবেষণায় এ তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার নিষ্পত্তির কথা থাকলেও গড়ে সময় লাগছে ৩ বছর ৭ মাস। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল প্রমাণ, সাক্ষীর অনুপস্থিতি ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া ১৩ শতাংশ মামলায় আপস করা হয় বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং প্রতিবন্ধকতাসমূহ নিরসনের কার্যকর উপায় চিহ্নিতকরণ’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। গতকাল শনিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে এক পরামর্শ সভায় গবেষণার পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ উম্মে কুলসুম। ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা (সেলপ) কর্মসূচির উদ্যোগে এ পরামর্শ সভার আয়োজন করা হয়।
উম্মে কুলসুম জানান, দেশের ৩২টি জেলার ৪২টি ট্রাইব্যুনালে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে একই বছরের জুন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া ৪ হাজার ৪০টি মামলার সময়সীমা, মুলতবি সংখ্যা, সময় আবেদনের পুনরাবৃত্তি, মামলার ধরন, সাক্ষী ও অভিযুক্তের তথ্য, ফরেনসিক পরীক্ষা ও রায়ের ধরন বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণায়নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন, ২০০০ অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে ৩ বছর ৭ মাস সময় লাগছে। প্রতিটি মামলায় গড়ে শুনানির তারিখ পড়ছে ২২ বার। বিচার বিলম্বের প্রধান কারণ হিসেবে অভিযোগকারী ও সাক্ষীর অনুপস্থিতি, ঘন ঘন সময় প্রার্থনা, তদন্তে বিলম্ব, দুর্বল প্রমাণব্যবস্থা এবং সাক্ষী সুরক্ষার অভাবকে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়, এসব সমস্যার সমাধান ছাড়া শুধু সময়সীমা কমিয়ে কার্যকর ফল পাওয়া যাবে না।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘পরিসংখ্যানে বাস্তব চিত্র এসেছে।’ নিম্নœ আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত পর্যন্ত জনবলকাঠামোতে কিছু অসামঞ্জস্য আছে উল্লেখ করে তিনি দ্রুত নিয়োগপ্রক্রিয়া চালু এবং জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের কার্যক্রম আরও কার্যকরী করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘জাতীয় বাজেটে বিচার বিভাগের বরাদ্দ তুলনামূলক কম, প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এই বরাদ্দ দিয়ে বিচারকদের বেতন, প্রশাসনিক ব্যয় ও অবকাঠামো পরিচালনা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।’
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেন বলেন, ‘কম সাজার হার দেখে অনেকেই এসব মামলাকে মিথ্যা মনে করেন, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।’ নারীর ওপর সহিংসতার প্রায় ৭০ শতাংশ ঘটনাই সামাজিক কাঠামো, কলঙ্ক, ভয় ও মানসিকতার কারণে আদালত পর্যন্ত আসে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সামাজিক কাঠামো, মানসিকতা ও স্টিগমা অনেক ভুক্তভোগীকে আদালতে আসতে বাধা দেয়।’
এদিকে নারী ও শিশু নির্যাতনের মাত্র ৩ শতাংশ সাজা ও ৭০ শতাংশ আসামির খালাসের বিষয়ে গবেষণা তথ্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ও মানবাধিকার নেত্রী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখেছি প্রায়শই পুলিশ নিরপেক্ষ তদন্ত করে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা আসামিপক্ষে অবস্থান নেয়। ফলে ভুক্তভোগী বিচার পায়না।’
সাক্ষী ঠিকমতো আসে না, এজন্যও অধিকাংশ আসামি খালাস পেয়ে যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাদী পক্ষ অনেক সময় আদালতে, আইনজীবী ও পুলিশের পেছনে বিচারের আশায় ঘুরতে ঘুরতে হতাশ হয়ে একপর্যায়ে আপসে বাধ্য হয়।’
তবে কেন মাত্র ৩ শতাংশ আসামি সাজা পায়, বেশিরভাগ আসামি কেন খালাস পায় এ বিষয়ে অবশ্যই গবেষণা হওয়া উচিত বলে মত দেন এই আইনজীবী ও মানবাধিকার নেত্রী।