সুন্দরবনে লতাসুন্দরী ফুল

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০২:০২ এএম

কতবার যে সুন্দরবনে গিয়েছি! প্রতিবারই সুন্দরী ও লতাসুন্দরী গাছ খোঁজার চেষ্টা করেছি। যে সুন্দরী গাছের জন্য সুন্দরবনের নাম, সেই সুন্দরী গাছের দেখা পেয়েছি কয়েক বার, নদীর কূলে ঝরে পড়া ফলের দেখাও পেয়েছি। কিন্তু সুন্দরী ফুলের দেখা পাইনি। অবশেষে সেই সুন্দরী ফুলের দেখা পেলাম এ বছর জ্যৈষ্ঠে। আইইউসিএন-এর তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে লতাসুন্দরী প্রায় বিপন্ন অবস্থায় বিলুপ্তির হুমকিতে রয়েছে। বিশেষ করে বাদাবনে চিংড়ি চাষ ও ফসল চাষাবাদ বৃদ্ধি পাওয়ায় এ গাছ উজাড় হওয়ার পথে। বিশ্বখাদ্য ও কৃষি সংস্থা কর্তৃক ১৯৮০ সালে এক জরিপে দেখা যায়, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপিন, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া থেকেও প্রায় ২৬ শতাংশ লতাসুন্দরী পূর্বের তুলনায় কমে গেছে। বাংলাদেশেও তদ্রুপ অবস্থা!

দুপুর ১২টার দিকে খুলনার কৈলাশগঞ্জের ঢাংমারি থেকে আমাদের নৌকা ছাড়ল। আকাশে মেঘের ঘনঘটা। যে কোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে। নৌকায় কোনো ছই নেই। বৃষ্টি এলে নির্ঘাত ভিজতে হবে। আমরা নদী ছাড়িয়ে সুন্দরবনের এক সরু খালের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। নিস্তব্ধ বন, পাখপাখালি আর ঝি ঝি পোকার ডাক মাঝেমধ্যে কানে আসছে। সেই সঙ্গে বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ যেন সেই

প্রাকৃতিক সংগীতে তাল দিচ্ছে। কথা বলতে না চাইলেও মুখ থেকে কথা বেরিয়ে আসছে। আর তাতে সেই প্রাকৃতিক সংগীতের তালভঙ্গ হচ্ছে। তবে দৃশ্যপটের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তীরের কাদামাটির মধ্যে লুটোপুটি খাচ্ছে হাওয়ায় মেতে ওঠা হরগোজা আর ধানশি গাছগুলো। পশুর গাছের ডাল নুয়ে পড়েছে জোয়ারের জলের চাতালে। সে গাছে ফুল ফুটেছে কি না তা দেখতে গিয়েই সে গাছের ডালে জড়ানো একটা লতার দেখা পেলাম। নাক ফুলের মতো ছোট গোলাপি ফুল ফুটেছে সে লতায়। পাতাগুলো লম্বাটে বর্শার ফলার মতো। লতাটা চিনছি না। মাঝিকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি জানিয়ে দিলেন, ‘উডা তো লতাসুন্দরীর গাছ।’ মুহূর্তে যেন মনের মধ্যে একটা শিহরণ খেলে গেল! এত যারে খুঁজেছি সেই কি না এখন নাগালের মধ্যে? তীব্র স্রোত। হু হু করে জোয়ারের জল নামছে, ভাটা হবে। নৌকা স্থির রেখে ছবি তোলা খুব কঠিন। মাঝিকে অনুরোধ করলাম গাছটার কাছে নৌকা নিয়ে ভিড়াতে। ভিড়ানো গেল না, কিন্তু গাছের ডালকে শক্ত করে ধরে নৌকাকে কোনো রকমে মিনিট খানিক রাখার চেষ্টা করলাম। কয়েকটা ছবি তুললাম। যদিও তা মনপূত হলো না। ফেরার পথে ছবিগুলো মনিটরে দেখে বড্ড আফসোস লাগছিল, এ রতœকে হাতে পেয়েও হারালাম! কেন বাদাবনে নামলাম না? বৃষ্টির ভয়ে দ্রুত ফেরার তাগিদই সব ভন্ডুল করে দিল।

লতাসুন্দরী গাছের জন্ম এশিয়ায়, বিশেষ করে পূর্ব ভারত থেকে মালয়েশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের কোনো এক স্থানে এর জন্ম হয়েছে। সে অর্থে এশিয়া এ গাছের আদিনিবাস। বাংলাদেশ, ভারত, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন, ব্রুনেই, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে দেখা যায়। বাংলাদেশে সুন্দরবন, চকরিয়া সুন্দরবন, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বরিশাল, পিরোজপুর, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে লতাসুন্দরী গাছ পাওয়া যায়। লতাসুন্দরীর অন্য নাম কেদার সুন্দরী, বলাসুন্দরী ও সুন্দরীলতা। ইংরেজি নাম উঁহমঁহ ধরত, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম ইৎড়হিষড়রিধ ঃবৎংধ, গোত্র মালভেসী।

লতাসুন্দরী প্রকৃতই সুন্দরবনের গাছ। এ গাছ বহুবর্ষজীবী, বহুশাখায়িত, দ্রুত বর্ধনশীল, চিরসবুজ গুল্ম প্রকৃতির। নাম লতাসুন্দরী হলেও এ গাছ আসলে অতটা লতানো না। গাছ ২ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। বাকল মসৃণ ও গাঢ় বাদামি থেকে কালচে। কচি ডগা ও কাণ্ডে অসংখ্য লেন্টিসেল বা বায়ুরন্ধ্র দেখা যায়। পাতা সরল, ডালে বিপরীতক্রমে সাজানো থাকে, পাতার নিচের পিঠ সূক্ষ্ম ও ঘন ক্ষুদ্র পশমাবৃত। পাতার কিনারা মসৃণ, পত্রাগ্র সূঁচাল, ওপরের পিঠ হলদে সবুজ, নিচের পিঠ সোনালী বাদামি। এপ্রিল থেকে জুন মাসে পাতা ও কাণ্ডের কোল থেকে ছড়ায় অনেকগুলো ফুল গুচ্ছাকারে ফোটে, ফুলের পাপড়ির রঙ গোলাপি, পাপড়ি পাঁচটি, কেশরগুচ্ছ হলুদ, ফুল বড় জোর এক সেন্টিমিটার। ফুল উভলিঙ্গী। ফল ছোট, হৃৎপিণ্ডাকার, ধূসর সবুজ ও কাষ্ঠল ক্যাপসুল ধরনের। লতাসুন্দরী গাছ মধ্যম লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। নদীর তীরে, খালের ধারে লতাসুন্দরী গাছ ভালো জন্মে। রোদ থেকে আংশিক ছায়া এ গাছের পছন্দ। বীজ থেকে চারা হয়।

লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত