অপতথ্যের বিরুদ্ধে সবাই মিলে দাঁড়াতে হবে

আপডেট : ০৩ মে ২০২৬, ০৭:৫৪ এএম

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্যের বিরুদ্ধে সবাই মিলে দাঁড়াতে হবে। এক্ষেত্রে সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, গবেষক, উন্নয়ন সংস্থা, সুশীলসমাজ সবার সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তি সবাইকেই। দৈনিক দেশ রূপান্তর ও উন্মুক্ত তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘ডেটাফুল’ আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা এই আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, অপতথ্যের কারণে মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে, সাম্প্রদায়িক উসকানি ও মব বেড়েছে, মূল ধারার গণমাধ্যম সম্পর্কে মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে। অবস্থা এমন  যে, অপতথ্যের ভিড়ে সত্যকেও এখন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বক্তারা বলেন, সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো যখন মানুষ জানে না কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা, তখন তারা সবকিছুকেই সন্দেহ করতে শুরু করে। 

আজ ‘বিশ^ মুক্ত গণমাধ্যম’ দিবসকে সামনে রেখে গতকাল সকালে রাজধানীর বাংলামোটরে দেশ রূপান্তর কার্যালয়ের কনফারেন্স কক্ষে ‘অপতথ্যের যুগে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা’ শীর্ষক এ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি অংশ নেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউল্যাবের সহকারী অধ্যাপক ড. আহমেদ আবিদুর রাজ্জাক খান। 

দেশ রূপান্তর সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, ‘অপতথ্যের বিরুদ্ধে ফ্যাক্ট চেকিংয়ের দায় আমাদের অর্থাৎ গণমাধ্যমের। কিন্তু আমাদেরও বিভ্রান্তির মধ্যে থাকতে হচ্ছে। কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা সবসময় তা আমরাও বুঝি না। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সামাজিক মাধ্যম এক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করছে, যা অশনিসংকেত।’

তিনি বলেন, ‘গত ৫০-৬০ বছরে কোনো সরকারই গণমাধ্যমকে সত্যিকার অর্থে চতুর্থ স্তম্ভ মনে করেনি। যারা সরকারের ক্ষমতায় থাকেন এবং যারা ক্ষমতার অপেক্ষায় থাকেন, উভয়েই অপতথ্য ছড়ানোর চেষ্টা। অপতথ্যের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক শক্তির দাঁড়ানো জরুরি। যুদ্ধটা আমাদের সবার। অপতথ্যের বিরুদ্ধে মানুষকে জাগ্রত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।’ 

ডেটাফুলের নির্বাহী পরিচালক পলাশ দত্ত অপতথ্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সম্মিলিত উদ্যোগের জায়গা থেকে এর বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে আমরা আরও কাজ করে যেতে চাই। সবাইকে এক জায়গায় আনতে চাই। সবাই মিলে যদি আমরা কাজ করি, একে অপরকে সহযোগিতা করি, তাহলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হবে।’

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাহবুব কামাল বলেন, ‘অপতথ্যে সত্য-মিথ্যা এক হয়ে যাচ্ছে। এর উদ্দেশ্য অনেক। এতে আমাদের রাজনৈতিক চিন্তা বিভ্রান্ত হচ্ছে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এটা এখন মহামারীর দিকে যাচ্ছে। একপক্ষ অপর পক্ষকে ঘায়েল করছে। কখনো কখনো মূলধারার গণমাধ্যমও আক্রান্ত হচ্ছে। একটা ভয়াবহ অবস্থার তৈরি হয়েছে।’

তিনি বলেন, অপতথ্যের প্রধান কারণ হচ্ছে সমাজ এখন বিভক্ত। আর বিভক্তির কারণে, এই সমাজকে বিপন্ন করতে তাদের (অপতথ্যকারী) হাতে যতকিছু আছে সবগুলো তারা ব্যবহার করছে।  

কলামিস্ট ও গণমাধ্যম বিশ্লেষক অধ্যাপক মো. সামসুল ইসলাম বলেন, ‘অপতথ্যের জন্য সামাজিক মাধ্যমকে আমরা দায়ী করছি, কিন্তু কখনো কখনো দায়িত্বশীল গণমাধ্যমও অপতথ্যে জড়িত হয়। অপতথ্যকে রাজনৈতিক ও অ্যানালাইটিক্যাল হিসেবে দেখলে হবে না। এটা এখন হুমকি হয়ে উঠছে।’

দৈনিক সংবাদের নির্বাহী সম্পাদক শাহরিয়ার করিম বলেন, ‘যারা অপতথ্য ছড়ায়, তাদের লক্ষ্যটা কি জনপ্রিয় হয়ে সামাজিক মাধ্যমে পয়সা কামানো, নাকি অন্য কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তা দেখতে হবে। সংবাদমাধ্যম দীর্ঘদিন ধরে বিপদে আছে। টিকে থাকার লড়াই করছে। ইন্টারনেটের সঙ্গে এআই (কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা) যুক্ত হওয়ায় সাংবাদিকতা একই সঙ্গে সহজ ও কঠিন হয়ে পড়েছে।’

তিনি বলেন, ‘কনভেনশন মিডিয়া থেকে মানুষ কতটুকু তথ্য নেয় এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিটি গণমাধ্যমে ফ্যাক্ট চেকিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে।’

অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক উদিসা ইসলাম বলেন, ‘ডিজইনফরমেশন (অপতথ্য) ও মিসইনফরমেশনের (ভুল তথ্য) কারণে আমাদের প্রতিদিন কয়েক ধরনের চ্যালেঞ্জে থাকতে হচ্ছে। অপতথ্য ব্যাপকভাবে ছড়ানো হচ্ছে, নারীরাও আক্রান্ত হচ্ছে। ভবিষ্যতেও আরও ছড়ানো হবে। এটার পেছনে ব্যবসা ও অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। সেগুলো খতিয়ে দেখতে হবে।’ 

সাউথ এশিয়া সেন্টার ফর মিডিয়া ইন ডেভেলপমেন্টের (সাকমিড) উপপরিচালক সৈয়দ কামরুল হাসান বলেন, ‘দেশে গণমাধ্যম উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান তিন থেকে চারটির বেশি নয়। কিন্তু অপতথ্যের রোগ ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুতগতিতে। তরুণ প্রজন্ম বিশেষ করে জেন-জি সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হচ্ছে। এখন থেকেই যদি এর বিরুদ্ধে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া না হয় তাহলে সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।’  

টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ প্রধান ফৌজিয়া আফরোজ বলেন, ‘ভুল তথ্য ও অপতথ্য নিয়ে সরকারের আইন তৈরির প্রবণতা আছে। কিন্তু আইন তৈরির সময় আইনগুলো বিশ্লেষণ করা হয় না। যারা এসবের ভুক্তভোগী তাদের সেখানে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয় না এবং লক্ষণীয় বিষয় হলো যারা আইনগুলো করেন তারাও কিন্তু ভুক্তভোগী হন।’

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউল্যাবের সাংবাদিকতা বিভাগের খ-কালীন শিক্ষক মোহাম্মদ মামুন রশিদ বলেন, ‘অপতথ্যের মাধ্যমে আমাদের চিরাচরিত ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস নষ্টের ষড়যন্ত্র চলছে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদদের সংখ্যা নগণ্য উল্লেখ করার প্রবণতাও দেখা যায় এবং এ ধরনের অপতথ্য নিয়ে শিশুরা বড় হচ্ছে, যা ভয়ংকর।’

শিক্ষা ইনস্টিটিউটগুলোতে সংস্কৃতির চর্চা খুবই কম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অপতথ্যের ধারণার বিস্তারিত এখনো ব্যাপকহারে জানা সম্ভব হচ্ছে না। মূল ধারার গণমাধ্যমের পাশাপাশি স্থানীয় সাংবাদিকদেরও এ বিষয়ে সোচ্চার ও যুক্ত করতে হবে।’  

আইএমএসের প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাখাওয়াত হোসাইন বলেন, ‘আমরা যখন প্ল্যাটফর্মকেন্দ্রিক মতামত দিতে শুরু করলাম, তখন কিন্তু এই অপতথ্যের ব্যাপকতা বেড়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি তাহলে প্ল্যাটফর্ম বাদ দিয়ে দেব? আমরা কি আগের যুগে ফেরত যাব? আমাদের তো আগের যুগে ফেরত যাওয়া সম্ভব নয়।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে মেটার ব্যবহারকারী কিন্তু কম নয়, কিন্তু এই দেশে তাদের কোনো অফিস নেই। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন একসঙ্গে এই প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর চাপ দিয়ে বলেছে, ব্যবসা করতে হলে তাদের নিয়ম মানতে হবে। আশিয়ানভুক্ত দেশগুলোও একটা প্ল্যাটফর্ম ফরম করেছে, যাতে করে ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোকে অ্যাকাউন্টিবিলিটির মধ্যে আনতে পারে। আমাদেরকেও বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে।’ 

অনুষ্ঠানের শুরুতে অপতথ্য কীভাবে, কাদের লক্ষ্য করে ছড়ায় সে বিষয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের শিক্ষক ড. সৈকত ঘোষ। তিনি জানান, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২ হাজার ৬৮৫টি ফেসবুক পোস্ট তারা বিশ্লেষণ করেছেন। এই পোস্টগুলো নেওয়া হয় ৩৭ জন ইফ্লুয়েন্সার ও ৪০টি ভুয়া সংবাদমাধ্যম থেকে। যাতে দেখা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন পোস্টের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ভুয়া নিউজ পেজগুলোতে দিনে গড়ে প্রায় ছয়টি পোস্ট ছিল। কিন্তু ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগের দিন (১১ ফেব্রুয়ারি) এটি বেড়ে দাঁড়ায় ১৩৪ পোস্টে, যা ২২ গুণ বেড়ে যায়। প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করে ড. সৈকত বলেন, অপতথ্যের লক্ষ্যবস্তু ছিলেন সাধারণ ভোটার, নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক ও গণমাধ্যম, ভারতবিদ্বেষী মনোভাব ও অন্তর্বর্তী সরকার। অপতথ্যের ইকোসিস্টেমে সাংবাদিকেরা একটি প্রধান লক্ষ্য। ভুয়া নিউজ ডেটাসেটে ৫৬৬টি পোস্টে সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকে লক্ষ্য করা হয়েছে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত