আসন্ন বাজেট কতটুকু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে

আপডেট : ০৪ মে ২০২৬, ১২:৫৫ এএম

সংকটে বিশ্ব অর্থনীতি। তার চেয়েও সংকটে বাংলাদেশের অর্থনীতি। অতি সম্প্রতি প্রায় প্রতিটি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষণীয়। অপরদিকে বাংলাদেশ সরকার রয়েছে আর্থিক চাপে। সরকারকে অর্থের জোগান দিতে গিয়ে বেসরকারি খাত থেকে ঋণের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। নতুবা টাকা ছাপাতে হবে। ফলে অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে, যা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এই অবস্থায় অল্প কিছুদিনের মধ্যেই অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে ৫৫তম বাজেট পেশ করবেন। যা বাজেটের আকার ৯ লাখ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। বিশাল এই বাজেট দেশের অর্থনীতিতে কতটা গতি সঞ্চার করতে পারবে, সেটি এখন বড় প্রশ্ন। দেশের অর্থনীতি সচল করতে না পারলে, সাধারণ মানুষের আশার প্রতিফলন ঘটবে না। বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে এক স্থির অবস্থায় বিরাজ করছে; এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ঋণাত্মক প্রবণতাও পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক গতি সঞ্চার করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে কি না, তা ভাবার বিষয়। ইতিমধ্যেই জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটাবে। অপরদিকে বিশাল বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সরকার বাধ্য হয়ে ভ্যাট বৃদ্ধি করতে পারে। এর প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের আয়ের ওপর। অর্থাৎ এটি মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। সুতরাং জাতীয় বাজেটে মূল চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা।

আমাদের দেশে বিভিন্ন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি একটি দুষ্টচক্রে আটকে যায়। যখন আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি পায়, তখন আমাদের দেশে তাৎক্ষণিকভাবে মূল্য সমন্বয় না করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের নামে বিলম্ব করা হয়। বাজারে সিন্ডিকেটকারীরা মজুদ শেষ করলে, পণ্যমূল্য বৃদ্ধি করা হয়। আমাদের দেশে একবার মূল্য বৃদ্ধি পেলে তা সহজে পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে না। এই অপসংস্কৃতি থেকে দেশকে রক্ষা করতে হবে। দেশে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি একটি স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতির পেছনে বাজার সিন্ডিকেট যেমন দায়ী, তেমনি রাষ্ট্রক্ষমতায় দায়িত্বরত ব্যক্তিবর্গ পরোক্ষভাবে দায়ী। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করার ফলে এর খেসারত দিতে হয় সাধারণ জনগণকে। ধরা যাক, ৯ লাখ কোটি টাকার বাজেট দেওয়া হবে, যেখানে অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। কিন্তু আলোচ্য বিষয় যেহেতু মূল্যস্ফীতি, তাই একটি দিক নিয়ে আলোচনা করা যাক। ৯ লাখ কোটি টাকার বাজেটে সরকার কম করে হলেও,  এক লাখ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণের মাধ্যমে বা ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে সংগ্রহ করবে। ফলে ওই টাকা সরকারের খরচের মাধ্যমে আবার জনগণের মধ্যে ফিরে আসবে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতে প্রান্তিক পর্যায়ে বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে বেকারত্ব বেড়ে যাবে এবং মূল্যস্ফীতিও বৃদ্ধি পাবে। ব্যাংক যদি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে বা নতুন উদ্যোক্তাদের সহজে ঋণ প্রদান করে, তবেই দেশে কাক্সিক্ষত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এতে বেকারত্ব কমবে এবং মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আসবে। সুতরাং উচ্চাভিলাষী বাজেট পরিহার করা উচিত।

বর্তমান সরকার যদি বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় এনে একটি সংকোচনমূলক বাজেট প্রণয়ন করে, তবে তা অধিকতর যুক্তিযুক্ত হবে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন। অপরদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে ‘মূল্যস্ফীতি সেভাবে বৃদ্ধি পাবে না’ বলে দাবি করেছেন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তিনি আরও বলেন, ‘সারা পৃথিবীতে জ্বালানির মূল্য যে অনুপাতে বৃদ্ধি পেয়েছে, তার তুলনায় বাংলাদেশে যে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে, তা অত্যন্ত সামান্য।’ তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘আমাদের এখানে যে বৃদ্ধিটা হয়েছে ডিজেলের ক্ষেত্রে ১০০ টাকার ডিজেলকে আমরা ১১৫ টাকা করেছি। আমি শুধু বোঝার জন্য বলছি, একটি শিল্পকারখানায় তাদের যে কস্ট অব প্রোডাকশন (উৎপাদন খরচ) থাকে, তার মধ্যে ৭ থেকে ৮ শতাংশ থাকে জ্বালানির মূল্য। সেই ৭ থেকে ৮ শতাংশকে যদি ১০০ শতাংশ ধরি, তার ১৫ শতাংশ ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি পায়, তবে তা মোট খরচে খুব সামান্য প্রভাব ফেলে।’ মন্ত্রী হয়তো মানুষকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন যদি তাই হয়, তবে তা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু এখানে তিনি সরল সুদের মতো একটি সরল হিসাব করেছেন, যেখানে চক্রবৃদ্ধি প্রভাবটি উপেক্ষিত হয়েছে। জ্বালানি তেল শুধু উৎপাদন খরচ বাড়ায় না; কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে পরিবহন ও বাজারজাতকরণ প্রতিটি ক্ষেত্রে এর প্রভাব লক্ষণীয়। সুতরাং চক্রবৃদ্ধির প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। তবে সাধারণ জনগণ যেন সহজ হিসাব নিয়ে স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যাতে মূল্যস্ফীতি তাদের নাগালের মধ্যে থাকে। এক মাসে দুবার এলপিজি গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম লাগামহীন। দ্রব্যমূল্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে হলে, কার্যকর জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। জাতীয় বাজেটে আরেকটি চ্যালেঞ্জিং বিষয় হলো, সরকারি কর্মকর্তাদের পে-স্কেল ঘোষণা বা বাস্তবায়ন।

অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া আকাশচুম্বী পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা অনেকটা ‘দিল্লির লাড্ডু’-এর মতো অবস্থা। বাস্তবায়ন করলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ে পস্তাতে হবে, আর বাস্তবায়ন না করলে সরকার বিপদে পড়তে পারে। সুতরাং সবকিছু মিলিয়ে জাতীয় বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। বিগত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ওপরে বিরাজমান থাকলেও, গত অর্থবছরে তা এক অঙ্কে নেমে আসে; তবে তা এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। বর্তমান অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা কত নির্ধারণ করা হয়, সেটাই দেখার বিষয়। সবার প্রত্যাশা, মূল্যস্ফীতি অবশ্যই সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকবে এবং লক্ষ্যমাত্রাও সে অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং দেশের অর্থনীতির যে অবস্থা বিরাজমান, তাতে মূল্যস্ফীতি লাগামহীন হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। এবারের বাজেটে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরাই হবে মূল লক্ষ্য। আর এ কারণেই এবারের বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ।

লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত