বাংলাদেশ কাবাডি ফেডারেশনের বিরুদ্ধে খেলোয়াড়দের বোনাসের অর্থ থেকে চাঁদা আদায়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। আন্তর্জাতিক আসরে পদকজয়ী নারী কাবাডি খেলোয়াড়দের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া সরকারি বোনাসের একটি অংশ ফেডারেশনের তহবিলে জমা দিতে বলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে খেলোয়াড়দের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
গত বছর ইরানের তেহরানে অনুষ্ঠিত এশিয়ান কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপে দীর্ঘ ২০ বছর পর ব্রোঞ্জ পদক জিতে দেশের কাবাডিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেন নারী খেলোয়াড়রা। এরপর নভেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত নারী কাবাডি বিশ্বকাপেও ব্রোঞ্জ জিতে তারা নিজেদের সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। এই দুই আসরে কৃতিত্বপূর্ণ পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে ১৫ জন নারী খেলোয়াড়কে প্রধানমন্ত্রী নিজে ২ লাখ টাকা করে বোনাস দিয়েছেন। খেলোয়াড়রা হলেন শ্রাবনী মল্লিক, বৃষ্টি বিশ্বাস, রুপালি আক্তার (সিনিয়র), স্মৃতি আক্তার, রেখা আক্তারি, মেবি চাকমা, রুপালি আক্তার (জুনিয়র), আঞ্জুয়ারা রাত্রি, সুচরিতা চাকমা, খাদিজা খাতুন, লোবা আক্তার, ইয়াসমিন খানম, ইসরাত জাহান সাদিকা, তাহরিম ও লাকী আক্তার। তাদের প্রত্যেকের বোনাস থেকে ১০ শতাংশ হারে অর্থ ফেডারেশনের একটি তহবিলে জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রত্যেকের ২০ হাজার করে টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় তিন লাখ।
তবে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া সেই বোনাস থেকেই অর্থ কেটে নেওয়ার উদ্যোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক খেলোয়াড় বলেন, ‘আমাদের বেশিরভাগই নিম্নআয়ের পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। বোনাসের অর্থ দিয়ে পরিবার চালানো, চিকিৎসা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে অর্থ দিতে যাওয়াটা আমাদের জন্য কষ্টকর।’
ফেডারেশন সূত্রে জানা গেছে, খেলোয়াড়, রেফারি ও জাজদের জরুরি সহায়তার জন্য একটি তহবিল গঠন করা হচ্ছে। এই তহবিল থেকেই ভবিষ্যতে ইনজুরি বা অন্যান্য সমস্যায় সহায়তা দেওয়া হবে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এই উদ্যোগ কতটা স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ফেডারেশনের কোষাধ্যক্ষ মাসুদুর রহমান চুন্নু এ বিষয়ে বলেন, ‘এই ধরনের তহবিল গঠনের প্রক্রিয়া আগে থেকেই চলে আসছে এবং সেটি অনুসরণ করেই বর্তমান উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ তবে বর্তমান কমিটির যুগ্ম সম্পাদক আবদুল হক জানান, তিনি খেলোয়াড়দের কাছ থেকে এত বড় অঙ্কের অর্থ নেওয়ার বিষয়ে অবগত নন। তার মতে, সাধারণত এ ধরনের তহবিলে দুই থেকে তিন হাজার টাকার বেশি নেওয়া হয় না।
অন্যদিকে সাবেক কোষাধ্যক্ষ এসএমএ মান্নান বলেন, ‘আমাদের সময় খেলোয়াড়দের কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়ার নজির ছিল না। বরং বিদেশে দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া রেফারিদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ নিয়ে তহবিল গঠন করা হতো।’
এই ঘটনায় ক্রীড়াঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার স্থায়ী আমানত থাকা সত্ত্বেও সেখান থেকে আপৎকালীন চিকিৎসা ফান্ড গঠন না করে কেন খেলোয়াড়দের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বোনাসের অর্থ থেকে চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে ফান্ড গঠন করা হবে, তা বোধগম্য না কাবাডি সংশ্লিষ্টদের। তাদের দাবি, খেলোয়াড়দের প্রাপ্য অর্থ থেকে কোনো ধরনের কাটছাঁট বা চাপ প্রয়োগের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাবেক ফুটবলার ও ক্রীড়া সংগঠক আবদুল গাফফার বলেছেন, ‘এটা খুবই ন্যক্কারজনক ঘটনা। কল্যাণ তহবিলের জন্য ফান্ড গঠন করতে হলে, অন্য অনেক উপায় রয়েছে। ক্রীড়াবিদদের বোনাসের অর্থ থেকে চাঁদা তুলে কেন ফান্ড গঠন করতে হবে!’ তিনি যোগ করেন, ‘আমি অনেক ক্রীড়াবিদের বিপদে সরকারের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে সহায়তা করেছি। কিন্তু কখনই তাদের কাছ থেকে ফান্ড গঠন বা অন্য কোনো কারণে কমিশন বা চাঁদা আদায় করিনি। এমন ঘটনা ক্রীড়াবিদদের ব্যথিত করে।’
