রাজনৈতিক দলগুলোকে দ্বিচারিতা পরিহারের আহ্বান

আপডেট : ০৪ মে ২০২৬, ০৬:২৭ এএম

নানা আয়োজনে গতকাল রবিবার পালিত হয় ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম’ দিবস। নানা প্রতিকূল পরিবেশ ও প্রতিবন্ধকতার মাঝেও গণমাধ্যমের এগিয়ে চলার আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেন এ পেশাসংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে সরকার আশ্বস্ত করে বলছে, একটি পূর্ণাঙ্গ গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা হবে। সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা দেবে সরকার। দিবসটি উপলক্ষে গতকাল বিকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সম্পাদক পরিষদ ও নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) আলোচনা সভার আয়োজন করে।

সভায় সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেছেন, গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা আরও কার্যকর করা, সরকার ও সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সংলাপ জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোকে দ্বিচারিতা পরিহারেরও আহ্বান জানান তিনি। সভায় প্রধান অতিথি তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নূরুল কবীর বলেন, দেখা গেছে রাজনৈতিক দলগুলো ‘দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা’র কথা বললেও সরকারে গেলে ভিন্ন অবস্থান নেয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলেও মন্তব্য করেন নূরুল কবীর।

দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক ও নোয়াব সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী বলেছেন, ভুয়া তথ্য ও অপতথ্যের বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বর্তমানে সামাজিক মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুক ও ইউটিউবে তথ্য আগে দেওয়ার প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় যাচাইহীন খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এতে মূলধারার গণমাধ্যম চাপে পড়ছে। আর ভুয়া তথ্যের কারণে সমাজে বিভক্তি তৈরি হচ্ছে, এমনকি সংঘাতের ঘটনাও ঘটছে। তাই ‘ভুয়া তথ্য’ ও ‘অপতথ্য’ রোধে প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন।

আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ, প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, কালের কণ্ঠ সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন, ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ, সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী, সময়ের আলোর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম ও সংবাদের নির্বাহী সম্পাদক শাহরিয়ার করিম। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।

‘গণমাধ্যম কমিশন’ গঠন করা হবে : তথ্যমন্ত্রী 

দিবসটি উপলক্ষে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় রাজধানীর তথ্য ভবন মিলনায়তনে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করে। এই অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে সরকার একটি শক্তিশালী ‘গণমাধ্যম কমিশন’ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করবে। পূর্ণাঙ্গ কমিশন গঠনের আগে গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের সমন্বয়ে একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করা হবে। আমরা একজন সর্বজনগ্রাহ্য গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞকে সামনে রেখে সব পক্ষের প্রতিনিধি নিয়ে একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করব। এই কমিটির মতামতের ভিত্তিতেই একটি স্থায়ী গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা হবে।

‘অবাধ তথ্য’ ও ‘অপতথ্য’ রোধের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘তথ্যের অবাধ সরবরাহ এখন আর সমস্যা নয়, বরং অপতথ্য ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা রোধই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।’ সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘বিনা অপরাধে কোনো সাংবাদিক কারাগারে থাকবে না। নীতিগতভাবে সব সাংবাদিককে আইনের আওতায় পেশাগত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে সরকার। মানহানির মামলাসহ অন্যান্য আইনি জটিলতাগুলো প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় আনা হবে।’

সভায় আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আব্দুল হাকিম। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মালিকদের সংগঠন অ্যাটকোর মহাসচিব ও একুশে টেলিভিশনের চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম, বিএফইউজের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী ও ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক মোস্তফা আকমল।

টিআইবির সেমিনার

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে ইউনেস্কো ও টিআইবি যৌথভাবে ধানম-িতে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করে। সভায় গণমাধ্যমকে শক্তভাবে সরকারের বিরুদ্ধে যৌক্তিক সমালোচনা করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, এই দেশে একটা দুর্দান্ত ‘ভাইব্রান্ট মিডিয়া’ আবার তৈরি হবে, এটা আমি দেখতে চাই। সভায় ৫ আগস্টের পর গ্রেপ্তার সাংবাদিকদের মুক্তির দাবি জানান গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। এ বিষয়ে তথ্য উপদেষ্টা জানান, নোয়াবের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে বিষয়টি উঠে আসে এবং প্রধানমন্ত্রী নিজে এটিকে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়েছেন। একই অনুষ্ঠানে দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে এসেছে। সরকারের দিক থেকে এখন পর্যন্ত কোনো চাপ আমরা অনুভব করছি না, কিন্তু মালিকদের দিক থেকে সেটা আমরা দেখি। আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন ইউনেস্কোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুজান ভাইজ, যমুনা টিভির সিইও ফাহিম আহমেদ, ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ, সাংবাদিক শাহনাজ মুন্নি প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত