জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের তৃতীয় দিনে মূল ফোকাস ছিল ‘স্মার্ট প্রশাসন’ গড়ে তোলা এবং প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া। বিশেষ করে দুর্নীতিমুক্ত স্থানীয় সরকারব্যবস্থা এবং তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ডিসিদের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত সম্মেলনে গতকাল মঙ্গলবার স্থানীয় সরকার, পররাষ্ট্র, বিদ্যুৎ জ্বালানিসহ প্রায় ৯টি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়ে পৃথক পৃথক অধিবেশনে ডিসিদের দেওয়া প্রস্তাবের ওপর আলোচনা শেষে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবরা নির্দেশনা দেন। বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন শেষ হচ্ছে আজ বুধবার।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিষয়ক অধিবেশন শেষে মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বিগত বছরগুলোতে স্থানীয় সরকারের জায়গাটি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে যে, ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। সেসব বিষয় মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে আমরা তদন্ত করব। একই সঙ্গে সেগুলো যেন ভবিষ্যতে না ঘটে, সেটাও দেখব। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যেসব কর্মসূচি রয়েছে, সেসব বাস্তবায়িত করার চেষ্টা করব।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আগামী এক বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকারের সব ধাপে নির্বাচন সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি গত ১৬ বছরে স্থানীয় সরকার খাতে সংঘটিত ব্যাপক দুর্নীতির তদন্ত করা হবে।’
স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করতে পারলে রাষ্ট্র শক্তিশালী হবে। ডিসি সম্মেলনে আমরা তাদের সামনে এ কথাটাই বলার চেষ্টা করেছি।’
উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে ডিসিদের নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জেলা প্রশাসকদের নেতৃত্ব দিতে হবে। আমাদের সরকারের, বিশেষ করে তারেক রহমান সাহেবের নেওয়া কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, জনগণকে সঙ্গেই নিয়ে কাজ করতে হবে। কারণ জনগণই এই দেশের মালিক। তৃণমূল পর্যায়ের মানুষই সবকিছু নির্ধারণ করেন।’
ডিসি সম্মেলনের গুরুত্ব তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘সরকারের জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের এমন মতবিনিময় অত্যন্ত ফলপ্রসূ। ভবিষ্যতে এ ধরনের মতবিনিময় ও যোগাযোগ আরও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।’
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখতে ডিসিদের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক মন্ত্রী : ডিসিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ, গবেষণা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও কল্যাণ নিশ্চিতে সরকার কাজ করছে। মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন। এই অর্জনকে আমরা লালন করি এবং ধারণ করি। এই অর্জনকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দিতে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।’
তিনি বলেন, ‘এই মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই স্বাধীনতার স্মৃতি সংরক্ষণ, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন, ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানসহ বিভিন্ন কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ভবিষ্যতেও এসব কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য।’
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ঠেকাতে ডিসিদের সহযোগিতা চাইলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী : মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বৈঠক শেষে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধার তালিকা করতে অতীতে নানা অনিয়ম হয়েছে। তাই সঠিক তালিকা করতে ডিসিদের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব অফিস না থাকায় বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসনের ওপর নির্ভর করতে হয়। এ প্রেক্ষাপটে জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সেশনটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিগত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বীর নিবাস প্রকল্পসহ প্রতিটি সেক্টরে যে দলীয়করণ ও দুর্নীতি হয়েছে ডিসিরা সে বিষয়ক কিছু সমস্যার কথা জানিয়েছেন। বিগত সরকারের অনিয়মগুলো খতিয়ে দেখে ভবিষ্যতে যাতে সেগুলোর পুনরাবৃত্তি না হয় তা নিশ্চিত করা হবে।’
জ্বালানি তেলের ঘাটতি নেই, কোথাও লোডশেডিং নেই বিদ্যুৎমন্ত্রী : বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের কোনো ধরনের ঘাটতি নেই এবং ভবিষ্যতেও এমন সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই। সরকার ইতিমধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ জ্বালানি তেল ক্রয়ের প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং বর্তমানে দেশে তেলের মজুদ সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে। তাই জ্বালানি সংকট নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর কোনো অবকাশ নেই।’
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রী দাবি করেন, ‘‘বর্তমানে দেশের কোথাও লোডশেডিং নেই। যদি কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকে, তবে সেটি মূলত সঞ্চালন লাইনের যান্ত্রিক ত্রুটি বা ‘ফল্টের’ কারণে হচ্ছে।’’
বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়ে তিনি ব্যাখ্যা দেন, পল্লী বিদ্যুতের লাইনগুলো অনেক দীর্ঘ হওয়ায় কোথাও কোনো ত্রুটি দেখা দিলে তা শনাক্ত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের কিছুটা সময় লাগে। এই কারিগরি সমস্যার কারণে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে, যা লোডশেডিং নয়। ত্রুটি সংশোধন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুনরায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করে দেওয়া হয়।
অন্যান্য কর্মসূচি : তৃতীয় দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের সঙ্গে প্রথম কার্য-অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. এ কে এম শামসুল ইসলামসহ তিন বাহিনীর প্রধানরা অংশগ্রহণ করেন।
বিকেলে জেলা প্রশাসকরা সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন এবং সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
ডিসিরা সরকারের প্রতিচ্ছবিপ্রধান বিচারপতি : ডেপুটি কমিশনারদের (ডিসি) সরকারের প্রতিচ্ছবি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। তিনি বলেছেন, তারা রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ ও সাধারণ জনগণের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করে। জেলা প্রশাসক সম্মেলন উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ডিসিরা। সুপ্রিম কোর্ট অডিটরিয়ামে তাদের উদ্দেশ্যে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন প্রধান বিচারপতি। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। প্রধান বিচারপতি ডিসিদের জনগণ, সমাজ, রাষ্ট্র, সৃষ্টিকর্তা সর্বোপরি নিজের বিবেকের কাছে যে দায়বদ্ধতা আছে, তা স্মরণ রেখে সবক্ষেত্রে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। এ সময় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতিরা উপস্থিত ছিলেন।
