আবার আলোচনায় দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত বালিশকা-ের ঘটনা। এবার সেই প্রসঙ্গ তুললেন খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার ২০২১-২২ অর্থবছরের ৩৮টি নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেন মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মো. নূরুল ইসলাম। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আলোচিত ‘বালিশ কান্ডের’ অডিট প্রতিবেদনও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী দেশ রূপান্তরকে এসব কথা জানান।
প্রেস সচিব বলেন, “প্রতিটি বালিশের একরকম অবিশ্বাস্য দাম শুনে সিএজিকে কথার ছলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই দামি বালিশের একটি জাদুঘরে রাখা উচিত’।”
তিনি বলেন, ‘শুধু বালিশকান্ড নয়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পর্দাকান্ড, বইকান্ড-, টিনকান্ড, ইভিএমকান্ড সরকারি কেনাকাটায় একের পর এক এমন নানা দুর্নীতিকান্ডের খবর দীর্ঘদিন ধরেই জনগণের মুখে মুখে ফিরছে। প্রধানমন্ত্রী সব দুর্নীতির তথ্য উদ্ঘাটন করে সংশ্লিষ্টদের বিচারের মুখোমুখি করার নির্দেশনা দিয়েছেন।’
প্রেস সচিব বলেন, ‘সিএজি যে প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করেছেন, তা পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।’
দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন : ২০১৯ সালের ১৬ মে ‘কেনা-তোলায় এত ঝাঁজ’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরে রূপপুর প্রকল্পের কেনাকাটায় দুর্নীতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যা পরে সারা দেশে ‘বালিশকান্ড’ নামে পরিচিতি পায়। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনটি সারা দেশে তুমুল আলোড়ন তুলেছিল। এর ফলে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা এবং মন্ত্রণালয়ের তদন্তের মধ্য দিয়ে মাস দুয়েকের মধ্যেই ওই দুর্নীতিকান্ডের বিচারে কিছুটা ইতিবাচক ফলও পাওয়া গিয়েছিল।
২০১৯ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ‘গ্রিন সিটি আবাসিক ভবনে’ আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী কেনাকাটায় অস্বাভাবিক মূল্য নিয়ে দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যে দেখা যায়, প্রকল্পের আবাসিক ভবনের জন্য ১৬৯ কোটি টাকার কেনাকাটায় ‘পদে পদে’ দুর্নীতি হয়েছে। একটি বালিশ কেনার পেছনে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬ হাজার ৭১৭ টাকা। এর মধ্যে প্রতিটি বালিশের দাম দেখানো হয় ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা। সেই বালিশ ফ্ল্যাটে ওঠানোর খরচও ৭৬০ টাকা দেখানো হয়।
এ ছাড়া কভারসহ প্রতিটি কমফোর্টারের (লেপ বা কম্বলের বিকল্প) দাম দেখানো হয় ১৬ হাজার ৮০০ টাকা। যদিও এর বাজারমূল্য সাড়ে ৪ হাজার থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ১৩ হাজার টাকা। একইভাবে বিদেশি বিছানার চাদর কেনা হয়েছে ৫ হাজার ৯৩৬ টাকায়। অথচ এর বাজারমূল্য ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা বলে খবরে বলা হয়।
পাঁচটি ২০ তলা ভবনের জন্য এসব কেনাকাটা হয়েছে। প্রতিটি তলায় রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট। প্রতিটি ফ্ল্যাটের জন্য কমফোর্টার শুধু বেশি দামে কেনাই হয়নি, কেনার পর দোকান থেকে প্রকল্প এলাকায় পৌঁছাতে আলাদা ট্রাক ব্যবহার করা হয়েছে। মাত্র ৩০টি কমফোর্টারের জন্য ৩০ হাজার টাকা ট্রাকভাড়া দেখানো হয়। একেকটি কমফোর্টার খাট পর্যন্ত তুলতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ২ হাজার ১৪৭ টাকা।
৩৬টি অডিট ও হিসাব রিপোর্ট প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন : রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং আর্থিক শৃঙ্খলা জোরদার করার লক্ষ্যে ৩৮টি অডিট (নিরীক্ষা) ও হিসাব রিপোর্ট প্রধানমন্ত্রীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। গতকাল সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে গিয়ে বাংলাদেশের মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মো. নুরুল ইসলাম রিপোর্টগুলো উপস্থাপন করেন। এসব রিপোর্টে প্রাপ্ত পর্যবেক্ষণ, সুপারিশসংক্রান্ত তথ্য রয়েছে। এ সময় মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, অর্থ সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই বিশালসংখ্যক অডিট রিপোর্ট পেশ করার মাধ্যমে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে আর্থিক শৃঙ্খলা (ঋরহধহপরধষ উরংপরঢ়ষরহব) নিশ্চিত করার একটি শক্তিশালী বার্তা প্রদান করা হয়েছে। এটি দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এই রিপোর্টগুলো গ্রহণ করার পর পরবর্তী ধাপগুলো হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধানের ১২৮ (৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এই রিপোর্টগুলো রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করা হবে এবং পরবর্তীতে তা জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হবে। এরপর সংসদীয় কমিটি রিপোর্টগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে। যদি কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয়, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তলব করাসহ অর্থ আদায়ের সুপারিশ করা হবে।
এই ৩৮টি রিপোর্টের মধ্যে বিভিন্ন ক্যাটাগরির নিরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বার্ষিক কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্ট : বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও সংস্থায় প্রচলিত বিধি-বিধান প্রতিপালিত হয়েছে কিনা, তা যাচাই করা হয়েছে। পারফরম্যান্স অডিট রিপোর্ট : সরকারের বিশেষায়িত প্রকল্প বা সেবার কার্যকারিতা এবং তা জনগণের কতটুকু কল্যাণে এসেছে, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আর্থিক অডিট রিপোর্ট : সরকারের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাবের সঠিকতা যাচাই করা হয়েছে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে উন্নয়নে গুরুত্ব প্রধানমন্ত্রীর : স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে এক বৈঠকে তিনি এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী পিরোজপুর জেলার সড়কগুলো দ্রুত মেরামত করে যান চলাচলের উপযোগী করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।
বৈঠকে পিরোজপুর জেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে বাস্তবায়িত এবং চলমান বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি, সমস্যা ও করণীয় নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক ও নির্বিঘœ রাখতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বিশেষ করে যেসব সড়ক দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত এবং বেহাল অবস্থায় রয়েছে, সেগুলোকে দ্রুত সংস্কার ও মেরামতের আওতায় আনতে হবে।’
এ সময় পিরোজপুরের সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন।
বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তারা পিরোজপুর জেলার এলজিইডি প্রকল্পগুলোর পূর্ববর্তী অগ্রগতি ও বাস্তবায়ন পরিস্থিতি তুলে ধরেন। আলোচনায় উঠে আসে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছিল। কয়েকটি প্রকল্পে তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লীউন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, পিরোজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর, পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুম সাঈদী, পিরোজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য রুহুল আমিন দুলাল, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব শহীদুল হাসানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
