কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) সিন্ডিকেট সভার সময় পার হয়ে গেলেও ছাত্রদল নেতাকর্মীদের চাপের মুখে সিন্ডিকেট সভা বন্ধ রেখেছে প্রশাসন। সভা বন্ধ রাখতে উপাচার্যকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কুবি ছাত্রদলের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে। গত ২৯ এপ্রিল এ ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায়। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন বিশ^বিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল মামুন, সদস্য সচিব মোস্তাফিজুর রহমান শুভ ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল বাশার। এদিকে দীর্ঘদিন সিন্ডিকেট সভা না হওয়ায় বিভিন্ন বিভাগের ২১ শিক্ষক ও চার কর্মকর্তাসহ মোট ২৫ জনের পদোন্নতিপ্রক্রিয়া আটকে আছে।
জানা যায়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী প্রতি তিন মাসে একবার সিন্ডিকেট সভা আয়োজনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও গত চার মাস ধরে তা বন্ধ আছে। সর্বশেষ গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৮তম সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এর পর দুই দফায় তারিখ নির্ধারণ করা হলেও ছাত্রদল ও বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের চাপে প্রশাসন তা স্থগিত করতে বাধ্য হয়। দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেট ও আপগ্রেডেশন বোর্ড সভা না হওয়ায় বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ২১ জন শিক্ষক ও চারজন কর্মকর্তাসহ মোট ২৫ জনের পদোন্নতি প্রক্রিয়া আটকে আছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পদোন্নতি প্রত্যাশী ২১ জন শিক্ষকের মধ্যে সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদের জন্য আবেদন করেছেন পরিসংখ্যান বিভাগের ড. জে. এম. আদিব সালমান চৌধুরী, অর্থনীতি বিভাগের নবীন কর কুন্তু, ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের সাইদুল আল-আমীন ও মাহবুব আলম এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ড. মো. খলিলুর রহমান।
অন্যদিকে সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য আবেদন করেছেন পরিসংখ্যান বিভাগের প্রিয়াংকা পাল ও আফরিনা আক্তার মিশু, রসায়ন বিভাগের মো. রাসেল মনি ও ড. মোহাম্মদ জুলহাস উদ্দিন, সিএসসি বিভাগের মো. হাসান হাফিজুর রহমান, অর্থনীতি বিভাগের মোহাম্মদ নাসির হুসেইন, লোকপ্রশাসন বিভাগের ড. কৃষ্ণ কুমার সাহা, আশিকুর রহমান ও মো. নাজমুল হক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ড. মো. বেলাল হুসাইন, মার্কেটিং বিভাগের ড. মো. আওলাদ হোসেন, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ড. মো. মঞ্জুর হোসেন, গণিত বিভাগের মো. আতিকুর রহমান ও ইংরেজি বিভাগের ইসরাত জাহান নিমনী।
এ ছাড়া প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য আবেদন করেছেন বাংলা বিভাগের মো. গোলাম মাহমুদ পাভেল ও আইসিটি বিভাগের কাশমী সুলতানা। এর মধ্যে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ড. মো. খলিলুর রহমান, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ড. মো. বেলাল হুসাইন, মার্কেটিং বিভাগের ড. মো. আওলাদ হোসেন ও বাংলা বিভাগের মো. গোলাম মাহমুদ পাভেলের পদোন্নতি বোর্ডের তারিখ কয়েকবার পরিবর্তন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সর্বশেষ আজ বুধবার গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রার্থীদের আপগ্রেডেশন বোর্ড ও আগামীকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় সিন্ডিকেট সভা হওয়ার কথা রয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলা বিভাগের প্রভাষক মো. গোলাম মাহমুদ পাভেল বলেন, ‘আমাদের আপগ্রেডেশন বোর্ড বসার কথা ছিল। পরে আমাকে ই-মেইলে জানানো হয়, অনিবার্য কারণে বোর্ড স্থগিত থাকবে। অনেকেরই প্রমোশন হতে বছর বা দেড় বছর সময় লাগে। তবে নির্ধারিত সময়ে না হলে আমি হয়তো আমার ভাতাটি পাব না।’
সহকারী রেজিস্ট্রার মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘সবাই যেন তাদের প্রাপ্য অধিকার অনুযায়ী সঠিক সময়ে প্রমোশন পায়।’
গত ২৯ এপ্রিল উপাচার্য অধ্যাপক ড. হায়দার আলীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রদল নেতারা। সেখানে তাদের মধ্যে হওয়া কথোপকথনের একটি ভয়েস রেকর্ড দেশ রূপান্তরের হাতে এসেছে। সেখানে ছাত্রদল নেতাদের বলতে শোনা যায়, ‘স্যার (উপাচার্য) আপনাকে ধন্যবাদ যে আপনি আমাদের কথা রেখে সিন্ডিকেট ও আপগ্রেডেশন বন্ধ রেখেছেন। বাকি সময়ও বন্ধ রাখবেন। এমনকি কোনো নিয়োগ বোর্ডও দেবেন না।’ একপর্যায়ে উপাচার্য বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী প্রতি তিন মাসে একবার সিন্ডিকেট করা আবশ্যক। অন্যথায় সরকারের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। তাই সিন্ডিকেট সভা করতেই হবে।’ অধিকাংশ সদস্য কুমিল্লায় আসতে ইচ্ছুক না হওয়ায় তারা এবার ঢাকায় সিন্ডিকেট সভা করতে বাধ্য হচ্ছেন। একথা শুনে ছাত্রদলের আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব ক্ষুব্ধ হয়ে উপচার্যকে বলেন, ‘আপনি ঢাকায় সিন্ডিকেট সভা করলে আর কুমিল্লায় আসতে পারবেন না। মনে হয় না, আপনি আর চেয়ারে বসতে পারবেন।’
এ সিন্ডিকেটে কতিপয় শিক্ষক ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা রয়েছে। উপাচার্যের কার্যালয়ে তারা অভিযুক্তদের শাস্তি না দেওয়ার বিষয়েও কথা বলেন। ছাত্রদলের নেতারা বলেন, উপরে উল্লেখিত ব্যক্তিরা যদি দোষী হয়, তাহলে তাদের আরেক সিন্ডিকেট সভায় শাস্তি দেওয়া যাবে।
এদিকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আমরা এ ধরনের কোনো কথা বলিনি। শুধু বাস, খাবার-দাবারের বিষয়ে কথা বলেছি। সিন্ডিকেট সভা নিয়ে কোনো কথা বলিনি।’
এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হায়দার আলী বলেন, ‘নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে যাওয়ায় আমরা ঢাকায় সিন্ডিকেট সভা করতে বাধ্য হচ্ছি। ক্যাম্পাসে না করে ঢাকায় সিন্ডিকেট সভা করার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, সিন্ডিকেট সভার অধিকাংশ সদস্যের ব্যস্ততার কারণে তারা কুমিল্লায় আসতে পারছেন না; তাই ঢাকায় করতে হচ্ছে। সিন্ডিকেট সভার এজেন্ডা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তা দেখে বলতে হবে। কোনো নিয়োগের বিষয় আছে কি না জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, নিয়োগ নেই; তবে কিছু শিক্ষকের আপগ্রেডেশন রয়েছে।
