সমকালীন স্বাধীন চলচ্চিত্র ধারায় যে কয়েকজন নির্মাতা নিজেদের মেধা এবং নিজস্ব ভিজ্যুয়াল বা দৃশ্যশৈলী দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন, মাহদী হাসান তাদের মধ্যে অন্যতম। স্কটল্যান্ডে বসবাসরত এই বাংলাদেশি নির্মাতা গতানুগতিক গল্পের ছক থেকে বেরিয়ে সেলুলয়েডের পর্দায় মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং নাগরিক জীবনের বিচ্ছিন্নতাকে নিপুণভাবে তুলে আনেন। তিনি এমন একজন শিল্পী, যিনি কেবল প্রথাগত সিনেমা নির্মাণে বিশ্বাসী নন, বরং দর্শককে ভাবনার এমন এক স্তরে নিয়ে যান যেখানে চারপাশের চেনা জগৎ এক নতুন অর্থ নিয়ে ধরা দেয়।
মাহদী হাসানের এই সাফল্যের পথযাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। ২০১৬ সালে প্রথমবার লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসবের জন্য চিত্রনাট্য পাঠিয়ে তিনি প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রত্যাখ্যানকে তিনি নিজের কাজের উন্নতির সোপান হিসেবে গ্রহণ করেন। বিচারকদের দেওয়া ফিডব্যাক বা মতামতগুলোকে ধারণ করে তিনি নিজের কাজকে আরও নিখুঁত করার নিরলস সাধনা চালিয়ে যান। তার এই অদম্য অধ্যবসায়ের ফলস্বরূপ ২০১৭ থেকে টানা তিন বছর তার স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রগুলো যথা ‘আই অ্যাম টাইম’, ‘ডেথ অব আ রিডার’ এবং ‘হোয়ার ইজ দ্য ফ্রেন্ডস হোম’ লোকার্নোর মতো মর্যাদাপূর্ণ উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং পুরস্কৃতও হয়।
স্যান্ড সিটি : নাগরিক জীবনের এক মনস্তাত্ত্বিক দর্পণ
নির্মাতার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মাইলফলক হলো তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘স্যান্ড সিটি’। এই সিনেমাটি ৫৯তম কার্লোভি ভ্যারি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ার হয় এবং সেখানে অত্যন্ত সম্মানজনক ‘প্রক্সিমা গ্র্যান্ড প্রি’ অর্জন করে। শুধু তাই নয়, বুসান, কায়রো এবং কান চলচ্চিত্র উৎসবের ‘লা ফ্যাব্রিকে সিনেমা’-এর মতো আসরে এই প্রজেক্ট প্রশংসিত ও নির্বাচিত হয়েছে।
‘স্যান্ড সিটি’ মূলত একটি ‘আরবান সেন্সরিয়াম সিনেমা’ বা নগর-সংবেদনশীল চলচ্চিত্র। এখানে অত্যন্ত সাধারণ এবং মামুলি একটি উপাদান ‘বালু’কে তিনি আধুনিক নাগরিক জীবনের ভঙ্গুরতা এবং অস্থিরতার রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। মাহদীর মতে, ঢাকা শহরটি যেন বালুর মতোই অস্থিতিশীল এবং হঠাৎ করে গড়ে ওঠা এক খণ্ডিত জনপদ। এই শহরের মানুষের ভেতরের একাকিত্ব, একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং জীবনের সামগ্রিক অনিশ্চয়তাকে তিনি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট দৃশ্যকাব্যের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।
সীমানা পেরোনো এক স্বতন্ত্র ভিজ্যুয়াল ভাষা
একজন নিখুঁতবাদী নির্মাতা হিসেবে মাহদী প্রতিটি দৃশ্য বা ফ্রেম নিয়ে গভীরভাবে কাজ করেন। তার ভিজ্যুয়াল স্টাইলে পেদ্রো কোস্তা বা মিকেলেঞ্জেলো আন্তোনিওনির মতো বিখ্যাত পরিচালকদের কাজের সূক্ষ্ম প্রভাব থাকলেও, তা সম্পূর্ণ নিজস্বতায় উজ্জ্বল। তিনি মনে করেন, চলচ্চিত্রের নিজস্ব একটি আন্তর্জাতিক ভাষা আছে, যা কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় আটকে থাকে না। কোনো চলচ্চিত্রকে প্রথাবদ্ধভাবে ‘বাংলাদেশি’ চেহারার হতে হবে, এমন স্টিরিওটাইপ বা বদ্ধমূল ধারণাকে তিনি নিজের কাজের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করেন।
দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি, সুইজারল্যান্ড ও লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো জায়গায় আন্তর্জাতিক রেসিডেন্সিগুলোতে অংশগ্রহণ এবং নিজের সৃষ্টির প্রতি চূড়ান্ত সততা মাহদী হাসানকে আজকের এই অনন্য অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে। তিনি কেবল একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের নির্মাতা হিসেবে নিজেকে গুটিয়ে রাখেননি; বরং মানুষের অন্তর্নিহিত শূন্যতা ও অস্তিত্বের সংকটকে বিশ্বজনীন ভাষায় রূপান্তর করে সমকালীন চলচ্চিত্র অঙ্গনে এক অপরিহার্য ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন।
