লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। শুক্রবারের (৮ মে) এই হামলায় এক সিভিল ডিফেন্স উদ্ধারকর্মীসহ অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে লেবাননের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। গত ১৭ এপ্রিল কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর এটি অন্যতম বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী হামলার ঘটনা।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, টায়ার জেলার তৌরা শহরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় দুই নারীসহ চারজন নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন। লেবাননের ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি (এনএনএ) জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ এক শিশুকে উদ্ধারে এখনো অভিযান চলছে।
এছাড়া, মারজায়ুন জেলার ব্লাত শহরে গত বৃহস্পতিবারের হামলায় নিখোঁজ দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছে লেবানন রেড ক্রস। শুক্রবার দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ, বিনত জবেইল এবং সিডনসহ বেশ কিছু এলাকায় ব্যাপক বোমাবর্ষণ করা হয়েছে। হাসবাইয়া জেলার কাফারশুবা ও কাফারহামাম সংযোগকারী সড়কে একটি গাড়ি লক্ষ্য করে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় জেনারেল ডিরেক্টরেট অফ সিভিল ডিফেন্সের এক সদস্য নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর আরবি ভাষার মুখপাত্র আভিচাই আদরাই দক্ষিণ লেবাননের নমাইরিহ, তাইর ফেলসাই, হালৌসিয়েহসহ বেশ কিছু গ্রামের বাসিন্দাদের অবিলম্বে এলাকা ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
এদিকে, হিজবুল্লাহর পাল্টা ড্রোন হামলায় উত্তর ইসরায়েলে দুই সেনা আহত হয়েছে, যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। দক্ষিণ লেবাননের দখলকৃত এলাকায় হিজবুল্লাহর অপর এক ড্রোন হামলায় আরও এক ইসরায়েলি সেনা আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, ইসরায়েলি পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের প্রতিবাদে গত ২৪ ঘণ্টায় তারা উত্তর ইসরায়েলের একটি সামরিক ঘাঁটি এবং দক্ষিণ লেবাননের দেইর সিরিয়ান ও আদশিত আল-কুসাইর এলাকায় ইসরায়েলি সেনা ও যানবাহনের ওপর একঝাঁক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিনিধি ওবায়দা হিত্তো টায়ার থেকে জানিয়েছেন, গত ১২ ঘণ্টায় ওই অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা ও উত্তেজনা কয়েকগুণ বেড়েছে। উপকূলীয় এলাকাগুলোতে দিনভর বিমান ও কামানের গোলাবর্ষণ চলছে।
গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে লেবাননে এখন পর্যন্ত ২,৭৫৯ জন নিহত এবং ৮,৫১২ জন আহত হয়েছেন। এই অস্থিরতার মধ্যেই আগামী ১৪ ও ১৫ মে ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে দ্বিতীয় দফার উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন প্রবীণ কূটনীতিক সাইমন কারামের সঙ্গে বৈঠকের পর জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন আলোচনার জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম বলেন, ‘আমরা এই আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী রূপ দিতে চাই। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো— হামলা বন্ধ করা, বন্দি মুক্তি এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা, যাতে বাস্তুচ্যুত মানুষ ঘরে ফিরতে পারে এবং পুনর্গঠন কাজ শুরু হয়।’
প্রধানমন্ত্রী আরও জোর দিয়ে বলেন, লেবানন সরকারই হবে একমাত্র আলোচনাকারী পক্ষ এবং রাষ্ট্রের হাতেই সকল অস্ত্র সীমাবদ্ধ রাখার ব্যাপারে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা নিয়ে লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গভীর বিভাজন দেখা দিয়েছে। হিজবুল্লাহ ও তাদের সমর্থকরা সরাসরি আলোচনার বিরোধিতা করে পরোক্ষ আলোচনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপে লেবানন সরকার সরাসরি আলোচনায় বসতে বাধ্য হচ্ছে।
হিজবুল্লাহকে জোরপূর্বক নিরস্ত্রীকরণের চাপ লেবাননের অভ্যন্তরীণ উত্তেজনাকে উসকে দিচ্ছে, যা ১৯৯০ সালে শেষ হওয়া গৃহযুদ্ধের স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গত নভেম্বরে হাসান নাসরুল্লাহর মৃত্যু ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর হিজবুল্লাহ এখন তাদের হারানো প্রভাব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
