চীন-বাংলাদেশ-পাকিস্তান সীমান্তে রেল প্রকল্প হাতে নিচ্ছে ভারত

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৮ এএম

চীন, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন কৌশলগত অঞ্চলগুলোতে ৪৫,০০০ কোটি রুপি (প্রায় ৪.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ব্যয়ে একটি বিশাল রেল অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিচ্ছে ভারত। আগামী ১৮ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা আগামী দুই বছরে ভারতের মোট পরিকল্পিত রেলওয়ে বাজেট বরাদ্দের প্রায় ২২ শতাংশ। 

এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো সীমান্ত অঞ্চলে বেসামরিক যোগাযোগের উন্নতির পাশাপাশি সামরিক লজিস্টিকস ও সেনা মোতায়েনের সক্ষমতা দ্রুততর করা।

বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ। 

এর আওতায় পাঞ্জাব, পশ্চিমবঙ্গ, হিমাচল প্রদেশ, রাজস্থান, আসাম এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্যে নতুন রেললাইন নির্মাণ, প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণ এবং বিদ্যমান রেল নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার কাজ করা হবে। 

সূত্রগুলোর দাবি, আগামী দুই বছরে ভারতের মোট রেল অবকাঠামো ব্যয়ের প্রায় ২২ শতাংশ এই সীমান্তভিত্তিক প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সীমান্ত অঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়নকে আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের এই উদ্যোগ শুধু বেসামরিক যোগাযোগ উন্নত করার জন্য নয়; বরং এমন দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য (ডুয়াল-ইউজ) রেল অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে, যা প্রয়োজনে সামরিক রসদ ও সেনা পরিবহনেও কাজে লাগবে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগতভাবে পিছিয়ে থাকা সীমান্ত অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থাও উন্নত হবে।

ভারত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে, বিশেষ করে চীনের সীমান্তসংলগ্ন এলাকায়, অবকাঠামো উন্নয়নের গতি বাড়ানোর প্রেক্ষাপটে এই বিনিয়োগ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুর্গম হিমালয় অঞ্চলে অবকাঠামোগত ঘাটতি কমাতে সড়ক, টানেল, সেতু এবং অন্যান্য যোগাযোগ প্রকল্পে জোর দিয়েছে নয়াদিল্লি।

এ ধরনের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে রেল যোগাযোগ পরিবহন সক্ষমতা বাড়িয়ে এবং সড়কনির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থার বিকল্প তৈরি করে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি এসব প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যন্ত সীমান্ত জেলাগুলোকে দেশের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা সম্ভব হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রস্তাবিত ৪৫ হাজার কোটি রুপির এই কর্মসূচির আওতায় চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সীমান্তসংলগ্ন অঞ্চলগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে ভারতের উত্তর, পশ্চিম ও পূর্ব সীমান্তজুড়ে এই রেল অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগ বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব বহন করছে।

ভারতের এই পরিকল্পনার পেছনে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২০ সালে চীনের সঙ্গে প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা স্থিতিশীল হলেও সতর্কতা বজায় রেখেছে নয়াদিল্লি। 

অন্যদিকে, পাকিস্তানের সঙ্গে সাম্প্রতিক উত্তেজনা এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন বাস্তবতাও সীমান্ত অবকাঠামো জোরদারের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিমালয় অঞ্চল, শিলিগুড়ি করিডর এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সব ধরনের আবহাওয়ায় চলাচলযোগ্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে সেনা মোতায়েনের সময় কমানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থা আরও নির্ভরযোগ্য করার লক্ষ্য রয়েছে ভারতের। 

এর আগে পাকিস্তান সীমান্তে প্রায় ১ হাজার ৪৫০ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণ এবং ভারত-চীন-ভুটান সীমান্তসংলগ্ন ডোকলাম এলাকার কাছাকাছি অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে মোদি সরকার। গত বছর কাশ্মীর উপত্যকার সঙ্গে ভারতের মূল ভূখণ্ডকে যুক্ত করতে বিশ্বের সর্বোচ্চ রেলসেতুও উদ্বোধন করা হয়।

এছাড়া গত এক দশকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার নতুন রেললাইন যুক্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ১৯৬২ সালের পর দীর্ঘদিন অচল থাকা কয়েকটি অ্যাডভান্সড ল্যান্ডিং গ্রাউন্ড পুনরায় চালু করে সেখানে হেলিকপ্টার ও সামরিক বিমানের কার্যক্রমও বাড়ানো হয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের রেল খাতে মূলধনি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন রেললাইন নির্মাণ, রেলপথ সম্প্রসারণ, বিদ্যুতায়ন, স্টেশন পুনর্উন্নয়ন এবং আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন প্রকল্পে বড় ধরনের বিনিয়োগ করা হয়েছে।

 সীমান্তকেন্দ্রিক এই নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতেও সেই অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত