প্রায় ৪৫,০০০ বছর আগে মানুষ গুহার দেয়ালে ছাপচিত্র এঁকে শিল্পচর্চার সূচনা করেছিল। যদিও ছাপচিত্রসহ কোনো শিল্পকলারই নির্দিষ্ট ও সুনির্ধারিত ইতিহাস নেই, তবুও মানবসভ্যতার দীর্ঘ বিবর্তনের ধারাকে উল্টো দিকে অনুসরণ করলে ছাপচিত্র বিকাশের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেই বিবেচনায় চীনকে ছাপচিত্রের জন্মভূমি ও উদ্ভাবক বলা হয়। অষ্টম শতাব্দীতে চীনারা কাঠের পাটাতনে খোদাই করে কাগজে মুদ্রণের মাধ্যমে বুদ্ধের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিত। এই পদ্ধতি পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। তখন ভারতবর্ষে রঙিন ছাপার প্রযুক্তি না থাকলেও ছাপচিত্রের মাধ্যমেই একসময় রঙিন বইয়ের প্রচলন ঘটে, যার উজ্জ্বল নিদর্শন আঠারো শতকের বটতলার বই।
ইউরোপে যখন ছাপচিত্র একটি নির্দিষ্ট নিয়মে বিকশিত হচ্ছিল, তখন ইংল্যান্ড ছিল কিছুটা স্বতন্ত্র ধারার। অন্যদিকে কলকাতা আর্ট কলেজ ও শান্তিনিকেতন রেখাচিত্র এবং সাদা-কালোর ব্যবহারে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করে। রবি বর্মা ও ললিতমোহন সেনের কাজ তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। পরে ভারতীয় ছাপচিত্রে নতুনত্বের অভাব ছিল—এ কথা বলা কঠিন। বিশেষ করে মোহাম্মদ কিবরিয়ার মিনিমালিস্ট ধারায় ফর্মের সীমাবদ্ধতা কমে গেলেও স্পেসের বিস্তৃতি এবং টেক্সচারের ব্যবহার নতুন মাত্রা যোগ করে, যা বাংলার চিত্রকলা ও ছাপচিত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। তবে ঢাকার ছাপচিত্রে দীর্ঘদিন তেমন নতুন কোনো প্রবণতা দেখা যায়নি। কিন্তু সম্প্রতি সে ধারণা পাল্টে দিয়ে নতুন নতুন পদ্ধতি ও নতুন ধরন তৈরি ও অনেক বেশি রঙিন হয়ে উঠেছে ছাপচিত্র। যার নিদর্শন আমরা দেখতে পাব কলাকেন্দ্রে শুরু হওয়া মাসব্যাপী ছাপচিত্র উৎসবে। এই গ্যালারিতে একই সঙ্গে দুটি আয়োজন উদ্বোধন করা হয়। ৩য় তলায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘১৪তম কিবরিয়া ছাপচিত্র মেলা’, এখানে দেশের ১৫টি ছাপচিত্র স্টুডিও অংশ নিয়েছে। আর ১ম তলায় চলছে ‘ছাপাই ছবির পথিকৃৎ’ শীর্ষক প্রদর্শনী, যেখানে সফিউদ্দীন আহমেদ, মোহাম্মদ কিবরিয়া, রফিকুন নবী এবং মনিরুল ইসলামের প্রারম্ভিক ছাপচিত্রগুলো প্রদর্শিত হচ্ছে।
১ম তলায় গ্যালারিতে প্রবেশ করলেই দেখা যাবে কিবরিয়া স্যারের লিথোগ্রাফিতে করা পাথরের গায়ে বিভিন্ন টেক্সচারের অভূতপূর্ব কাজগুলো। প্রাচীন স্মৃতি বহনকারী উপাদান এই পাথরের গায়ে টেক্সচারগুলো যেন মানুষের সুখ দুঃখের সাক্ষী হয়ে গ্যালারিতে অবস্থান করছে। শিল্পগুরু সফিউদ্দীনের উড-এনগ্রেভিংয়ের কাজগুলো সূক্ষ্ম, জটিল ও গতিশীল। রফিকুন নবীর প্রায় পাঁচ দশকের কাঠখোদাই পদ্ধতির কাজ এ প্রদর্শনীতে জায়গা করে নিয়েছে। এ ছাড়াও শিল্পী মনিরুল ইসলাম তার ইমেজকে দিয়েছেন অনন্তের ব্যঞ্জনা, যা দেখা যায় না, উপলব্ধি করতে হয়। তিনি তার শিল্পকর্মকে অনুকরণের পথ থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে প্রতীক ও বিমূর্ততার দিকে ধাবিত করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন শূন্যতারও একটা রূপ আছে। তিনি সেই অরূপের রূপ সন্ধানী।
গ্যালারির ৩য় তলায় আয়োজিত ‘১৪তম কিবরিয়া মেলা’য় সমসাময়িক শিল্পীদের তৈরি ছাপচিত্রের এক বিশাল সংগ্রহ উপস্থাপিত হয়েছে। দেয়ালজুড়ে নানা পদ্ধতিতে নির্মিত ছবিগুলোর রেখা যেন প্রাণ পেয়ে ছুটে চলেছে দ্রুততার সঙ্গে। শিল্পীরা ভিন্ন ভিন্ন ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন সমাজের অসংগতি, অস্থিরতা, বৈষম্য, প্রতিকূলতা, প্রযুক্তি ও প্রকৃতির টানাপড়েন—কখনো প্রতীকী ভাষায়, আবার কখনো বাস্তবধর্মী ধারায়।
এই প্রদর্শনী দেখলে ‘ছাপচিত্র মানেই সাদা-কালো’ এমন ধারণা ভেঙে যাবে। সূক্ষ্ম রেখার কাজের পাশাপাশি রঙের বৈচিত্র্য দর্শকদের বিস্মিত করবে। এখানে দেশি-বিদেশি প্রায় ৩০ জন শিল্পীর কাজ কিংবা তাদের সংগ্রহ থেকে নেওয়া শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে। এগুলোকে ১৫টি স্টুডিওভিত্তিক সংগ্রহশালায় আলাদাভাবে সাজানো হয়েছে, ফলে দর্শক একই পরিসরে ভিন্ন ভিন্ন প্রজন্মের শিল্পীদের কাজ, কৌশল, দৃষ্টিভঙ্গি, ভাবনার পরিবর্তন ও তার স্বাদ উপভোগ করতে পারবেন। এ এক সুবর্ণ সুযোগ।
ছাপচিত্র চর্চা সহজ নয়—ব্যক্তিগতভাবে স্টুডিও স্পেস ও প্রিন্ট মেশিনের ব্যবস্থা করা ব্যয়বহুল ও কঠিন। তবুও এসব প্রতিকূলতা পেরিয়ে শিল্পীরা যে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, তা নতুন শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে। প্রতি বছর কিবরিয়া ছাপচিত্র মেলা এদেশের ছাপচিত্র সংলগ্ন সংস্কৃতিকে উজ্জীবিত করছে। এর মূল লক্ষ্য—সমাজে ছাপচিত্র তথা শিল্পের বার্তা সমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়া। ‘১৪তম কিবরিয়া ছাপচিত্র মেলা’ চলবে আগামী ৯ মে ২০২৩ পর্যন্ত এবং ‘ছাপাই ছবির পথিকৃৎ’ প্রদর্শনী চলবে ২৩ মে ২০২৩ পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকাল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে কলাকেন্দ্রের নতুন গ্যালারিতে।
