উন্নয়ন নাকি ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য পরীক্ষা

আপডেট : ১০ মে ২০২৬, ০৭:১৩ এএম

বাংলাদেশের মানুষ অনেক দিন ধরে শুনছে রূপপুরের গল্প। পদ্মার পাড়ে গড়ে উঠছে বিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, যার আলোয় একদিন ঘর-বাড়ি, কলকারখানা আর রাতের পথঘাট ভেসে যাবে সোনালি আলোয়। ২০২৬ সালের এপ্রিলে সেই স্বপ্নের দরজায় একটু বেশি জোরে কড়া নাড়ল বাংলাদেশ। প্রথম ইউনিটে জ্বালানি ইউরেনিয়াম ঢোকার খবর এলো। অনেকের মনে হলো, এবার তবে হয়ে গেল। হ্যাঁ, সত্যিই যেন হয়ে গেল। আর বাংলাদেশ ঢুকে পড়ল সেই অভিজাত ক্লাবে, যেখানে প্রযুক্তির শক্তিতে বলীয়ান দেশগুলো অবস্থান করছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাশিয়ার কৌশল, ভারতের ভূমিকা এবং বাংলাদেশের আকাক্সক্ষার জটিল সমাবেশ। সহজ ভাষায় বললে, এটি যেন তিনটি দেশের স্বার্থের সংযোগস্থল, যেখানে প্রত্যেকের উদ্দেশ্য ভিন্ন। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে,  প্রথমেই নজর পড়ে প্রকল্পটির মূল কারিগরের দিকে। রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ‘রোসাটম’ প্রযুক্তি সরবরাহ করলেও, বর্তমান বৈশি^ক প্রেক্ষাপটে মস্কোর হাসি আলাদা অর্থ বহন করে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত রাশিয়া, এশিয়ার বুকে নিজের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার একটি লাইভ শোকেস তৈরি করতে চেয়েছে। রূপপুর সেই শোকেসের কাচের জানালা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে রাশিয়ার লাভ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক; উভয় ক্ষেত্রে। কিন্তু এই ব্যবস্থায় বাংলাদেশের লাভের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে এক ধরনের নির্ভরতার শৃঙ্খল। তারা এখানে শুধু প্রযুক্তি বিক্রি করছে না, করছে এক ধরনের প্রযুক্তিগত কূটনীতি। আর বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে ঠিক মাঝখানে।

ভারত আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের কারণে বিদেশে পারমাণবিক চুল্লি রপ্তানি করতে পারে না। তবুও তারা রূপপুর প্রকল্পে সম্পৃক্ত রয়েছে। কীভাবে? তারা দিয়েছে টারবাইন, ট্রান্সমিশন লাইন এবং কুল্যান্ট সিস্টেম। যাকে বলা হয় ‘অ-পারমাণবিক অবকাঠামো’। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে রুশ প্রযুক্তিতে আর সেই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত হবে ভারতীয় সহায়তায়। কেবল চ্যালেঞ্জের দিক তুলে ধরা একপাক্ষিক হবে। রূপপুরের ইতিবাচক দিক কম নয়। এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন একটি বড় অর্জন। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে লোডশেডিং হ্রাস পাবে, শিল্পোৎপাদন গতিশীল হবে এবং বিদ্যুৎ ঘাটতি কমে আসবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা প্রথমবারের মতো পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনায় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন। সব মিলিয়ে এটি একটি সাহসী ও দূরদর্শী উদ্যোগ। তবে এই সাহসের সঙ্গে প্রয়োজন সতর্কতা এবং সুপরিকল্পিত কৌশল। কারণ যেখানে সরল অর্থনৈতিক হিসাব শেষ হয়, সেখান থেকেই শুরু হয় কূটনীতির জটিল অঙ্ক। তবে এটুকু বলা যায়, রূপপুরকে ঘিরে মহাশক্তিগুলোর দৃষ্টি বাংলাদেশের জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে যেমন দরকার দক্ষ প্রকৌশলী, তেমনি প্রয়োজন এমন কূটনীতিক, যারা রুশ প্রযুক্তি, ভারতীয় অবকাঠামো এবং বাংলাদেশের স্বার্থ এই তিনের মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য তৈরি করতে পারেন।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত