শিক্ষা শুধু অক্ষরজ্ঞান নয়, এটি মানবিক মর্যাদার ভিত্তি, অর্থনৈতিক মুক্তির পথ এবং সামাজিক রূপান্তরের শক্তিশালী হাতিয়ার। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল শাসন নয়, নাগরিকের সম্ভাবনাকে বিকশিত করার পরিবেশ তৈরি করাও। সেই দায়িত্বের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিফলন হলো, বার্ষিক বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দের অগ্রাধিকার। অথচ বাজেটের পর বাজেটে শিক্ষা খাত এমন একটি অবস্থানে থেকে যাচ্ছে, যা দেখে মনে হয় রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ নয়, বর্তমান ব্যয় সংকোচনকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছিলেন উন্নয়ন মানে কেবল জিডিপির প্রবৃদ্ধি নয়, উন্নয়ন মানে মানুষের সক্ষমতার বিকাশ। আর সেই সক্ষমতা আসে শিক্ষা থেকে। একটি শিক্ষিত সমাজ শুধু বেশি উৎপাদন করে না, সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায়সংগত পরিবর্তন আনার ক্ষমতাও রাখে। এই অনুধাবন থেকে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো শিক্ষায় যে পরিমাণ বিনিয়োগ করে, তা কেবল নীতির অংশ নয় বরং এটি তাদের জাতীয় দর্শনের প্রতিফলন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে এই দর্শন এখনো রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। ইতিহাস সাক্ষী, যে জাতি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, সে জাতি অপরাজেয় হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ধ্বংসস্তূপে পরিণত জাপান মাত্র কয়েক দশকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল। এর মূল রহস্য, শিক্ষায় তাদের নিরন্তর ও অনম্য বিনিয়োগ।
দক্ষিণ কোরিয়া ষাটের দশকে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা একটি কৃষিভিত্তিক দেশ ছিল। আজ সেই দেশ বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির শীর্ষে। এই রূপান্তরের চালিকাশক্তি ছিল শিক্ষা খাতে তাদের ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ। দেশটি আজ জিডিপির প্রায় ৫.১ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয় করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি শিক্ষিত, সচেতন ও সাম্যভিত্তিক সমাজ গড়ার স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্নের পরিপ্রেক্ষিতে বাস্তবতা হতাশাজনক। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ আমাদের জনশক্তি। বিশাল এই জনগোষ্ঠী যদি দক্ষ হয়, তাহলে এটি হয়ে ওঠে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় আমূল সংস্কার দরকার। বর্তমানে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার মাত্র ১৭.২ শতাংশ, যা প্রতিবেশী ভারতের তুলনায়ও অনেক কম। শিক্ষিত বেকারের হার এখন ৪৭ শতাংশ, এটি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়। একটি রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যর্থতার সরাসরি প্রতিফলন। শিক্ষা যখন কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়, যখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার পরিবর্তে সনদের কারখানায় পরিণত হয়, তখন বরাদ্দ বাড়ালেই কাক্সিক্ষত ফল আসে না। তাই বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি কাঠামোগত সংস্কারও সমানভাবে জরুরি। এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে আমাদের বাংলাদেশি কর্মীরা বেশিরভাগ সময় অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে যান এবং তুলনামূলক কম মজুরি পান। অথচ ফিলিপাইন, যে দেশের জিডিপি একসময় আমাদের কাছাকাছি ছিল আজ তারা দক্ষ নার্স, ইঞ্জিনিয়ার এবং প্রযুক্তিবিদ রপ্তানি করে বিশাল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। এই রূপান্তরের চালিকাশক্তি শিক্ষায় বিনিয়োগ। বাংলাদেশেও এই পরিবর্তন সম্ভব কিন্তু তার জন্য শিক্ষা বাজেটকে প্রতীকী সংখ্যা থেকে বের করে কৌশলগত বিনিয়োগে পরিণত করতে হবে। রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে জ্ঞান ও দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর এটিই আগামীর বাংলাদেশের টেকসই পথ। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে, উন্নত বিশ্বের শিক্ষা বরাদ্দের সঙ্গে তুলনাটি অপ্রিয় হলেও জরুরি। ফিনল্যান্ড জিডিপির প্রায় ৬.৮ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয় করে এবং বিশ্বের সেরা শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে বারবার স্বীকৃতি পেয়েছে। মালয়েশিয়া করে ৪.৪ শতাংশ, ভারত এখন ৩.৫ শতাংশের ঘরে। ইউনেস্কো দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ অথবা মোট বাজেটের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলে আসছে। আর বাংলাদেশ? মাত্র ১.৭২ শতাংশ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষায় জিডিপির অনুপাতে ব্যয়ের বিচারে বিশ্বের প্রায় ১৬০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫৫তম। এই তুলনা কেবল সংখ্যার নয়, দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যেরও। ফিনল্যান্ড মনে করে প্রতিটি শিশু মেধাবী, রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই মেধাকে বিকশিত করার পরিবেশ তৈরি করা। বাংলাদেশে শিক্ষাকে এখনো অনেকাংশে ব্যক্তির একার দায় হিসেবে দেখা হয়, রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষায় মোট বরাদ্দ মোট বাজেটের প্রায় ১২.১ শতাংশ রাখা হয়েছে, যা সংখ্যার বিচারে আগের বছরের তুলনায় সামান্য বেশি। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে ৪৭ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে যা আগের বছরের চেয়ে ৭.৮৩ শতাংশ বেশি। কিন্তু বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ কমানো হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগসহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অর্থনীতিবিদরা স্পষ্টভাবে বলেছেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে এডিপি বরাদ্দ কমানো উদ্বেগজনক।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যুক্তি হলো দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়নের জন্য এডিপি বরাদ্দ কমানো হয়েছে এবং গুণগত উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়া হবে। এই যুক্তি এক দিক থেকে গ্রহণযোগ্য হলেও অন্য দিক থেকে প্রশ্ন রেখে যায় বরাদ্দ না থাকলে উন্নয়ন হবে কীভাবে? বাস্তবায়নে দুর্নীতি রোধের জন্য বরাদ্দ কাটছাঁট নয়, বরং তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করাই হওয়া উচিত সঠিক পদক্ষেপ। বিগত বছরগুলোর চিত্র আরও উদ্বেগজনক। শিক্ষা খাতে বরাদ্দের একটি বড় অংশ শিক্ষকদের বেতন-ভাতায় চলে যায়। প্রকৃত গুণমান উন্নয়নে গবেষণা, প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল অবকাঠামোয় বরাদ্দ যথেষ্ট নয়। এছাড়া এমপিওভুক্তি, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং আঞ্চলিক বৈষম্য শিক্ষা বাজেটের কার্যকারিতাকে গুরুতরভাবে ক্ষুণœ করে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, ১৯ হাজারেরও বেশি কওমি মাদ্রাসায় পড়া প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থী আজও মূল বাজেট বরাদ্দের বাইরে। দাওরায়ে হাদিসের সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হলেও এই বিশাল শিক্ষার্থী গোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের কোনো কার্যকর পথ তৈরি হয়নি। জাতীয় শিক্ষার মূলধারার সঙ্গে তাদের সংযুক্ত না করলে সামাজিক বিভাজন দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর হবে।
বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বলছে, প্রাথমিক শিক্ষায় প্রতি ডলার বিনিয়োগের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদে ১০ ডলার পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রতিদান আসে। এই হিসাব মাথায় রাখলে শিক্ষায় বরাদ্দ কমানো আর ভবিষ্যৎ থেকে ঋণ নেওয়া একই কথা। আসন্ন বাজেটে শিক্ষা খাতকে রূপান্তরমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা দরকার। জিডিপির অন্তত ৩ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ থাকা উচিত এবং পাঁচ বছরের মধ্যে ৪ শতাংশে পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা জরুরি। আবার বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, কোথায় ব্যয় হচ্ছে তার স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করতে হবে। কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশে উন্নীত করার স্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির উৎস হিসেবে গড়ে তোলা না হলে প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে। আগামী দশকের বাংলাদেশ কতটা সমৃদ্ধ হবে, কতটা ন্যায়সংগত হবে, কতটা আত্মনির্ভরশীল হবে তার নির্ধারক সিদ্ধান্তগুলো নির্ধারণ করবে এবারের বাজেটে। শিক্ষাকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখার এই মানসিক ও নীতিগত রূপান্তরই হবে টেকসই উন্নয়নের প্রকৃত চাবিকাঠি।
লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষক
