বিজেপির জয়ে বামদের অবদান

আপডেট : ১২ মে ২০২৬, ০৭:১৫ এএম

ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের সবশেষ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের রাজত্বের অবসান হয়েছে। ২৯৪ আসনের বিধানসভার মধ্যে ২০৭টি আসনে জয় নিয়ে নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবার রাজ্যটিতে সরকার গঠন করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ভারতের এই কট্টর জাতীয়তাবাদী দলটি কেন্দ্রীয় সরকারে ক্ষমতায় আসার পর থেকে যে দুর্গগুলো দখলে খাবি খাচ্ছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম পশ্চিমবঙ্গ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন রাজ্যটিতে বিজেপির উত্থানের পেছনে ভোটারদের যেমন তৃণমূলবিরোধী মনোভাব কাজ করছে, তেমনি এই পরিবর্তনে অন্যতম বড় ভূমিকা পালন করেছেন বাম দলগুলোর একনিষ্ঠ ভোটাররা।

ভোটারদের দল বদলানোর বিষয়টি অস্বাভাবিক কিছু নয়। দলগুলো এভাবেই জেতে। কিন্তু সিপিআই (এম)-এর মতো বাম দলগুলোর ক্ষেত্রে এমনটা ঘটা সত্যিই বিস্ময়কর। কারণ, বাম ভোটাররা মতাদর্শগতভাবে অনেক বেশি অনুগত এবং তাদের অনেকেই খুব অল্প বয়সে বাম ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। এ ছাড়া ১৯৭৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত টানা ৩৪ বছর রাজ্য শাসন করায় পশ্চিমবঙ্গে বাম দলগুলোর এক বিশাল নেটওয়ার্ক ছিল। বিশেষজ্ঞ, ভোটার এবং বাম কর্মীরা বলেছেন, বাম থেকে ডানে (বিজেপি) এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি বেশ কিছু বছর ধরেই চলছিল। তারা বিশেষত ২০১৮ সালের কথা উল্লেখ করেন। ওই বছর পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর তৃণমূল কংগ্রেস সিপিআই(এম) ক্যাডারদের ওপর ব্যাপক হামলা চালালে বাম কর্মী-সমর্থকরা দলে দলে বিজেপির দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে এর পরিষ্কার প্রতিফলন দেখা যায়। ২০১৪ সালে মাত্র দুটি আসন পাওয়া বিজেপি ২০১৯ সালে ১৮টি আসনে জয়লাভ করে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও এর প্রভাব পড়ে এবং বিজেপির আসনসংখ্যা লাফিয়ে ৭৭-এ পৌঁছায়। তৃণমূল কর্মীদের রাজনৈতিক সহিংসতার মুখে বামদের সাংগঠনিক কাঠামো যখন দুর্বল হতে থাকে, তখন তাদের তৃণমূলবিরোধী ভোটারের একটি অংশ বিজেপির দিকে ঝুঁকতে শুরু করে।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়। সেবারই প্রথম বাম দলগুলো একটি আসনও জিততে পারেনি এবং তাদের ভোট ২০১৪ সালের ৩০ শতাংশ থেকে কমে ৮ শতাংশের নিচে নেমে আসে। কলকাতাভিত্তিক লেখক ও শিক্ষাবিদ স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য বলেন, বামরা তাদের অর্ধেকের বেশি ভোটার বিজেপির কাছে হারানোয় এমনটি ঘটেছিল। তিনি বলেন, বামরা ওই ভোটারদের ২২ শতাংশকেও আর ফিরিয়ে আনতে পারেনি। এটা স্পষ্ট ছিল যে, বামদের এই পতনে বিজেপিই লাভবান হচ্ছিল। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি তাদের আসনসংখ্যা ২০১৪ সালের থেকে দুটি বাড়িয়ে ১৮টিতে (৪২টির মধ্যে) নিয়ে যায় এবং তাদের ভোটের হার ১৭ শতাংশ থেকে এক লাফে ৪০ শতাংশে পৌঁছায়।

পশ্চিমবঙ্গের নিউ বারাকপুরে কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার (মার্ক্সবাদী) একজন কর্মী সঞ্জিত রায়। তিনি বলেন, ‘আমাদের দল ততটা শক্তিশালী না হওয়ায় তৃণমূলকে ক্ষমতাচ্যুত করতেই আমাদের সমর্থকরা বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন।’ গত ৪ মে ভবানীপুর আসনে তৃণমূল নেত্রী ও তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করার পর নিজের বিজয়ী ভাষণে এই সত্যটি স্বীকার করে নিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। তিনি বলেন, ‘ভবানীপুরে সিপিএমের ১৩ হাজার ভোট ছিল, যার মধ্যে অন্তত ১০ হাজার ভোট আমাকে দেওয়া হয়েছে।’ উত্তর দমদমসহ পশ্চিমবঙ্গের অসংখ্য আসনেই এই ভোট স্থানান্তরের চিত্র দেখা গেছে। উত্তর দমদমে একসময় সিপিআইয়ের (এম) একচ্ছত্র ভোটব্যাংক ছিল। কিন্তু সেখানেও একই চিত্র দেখা গেছে।

একজন বাম ভোটারের কাছে বিজেপি হয়তো চরম অপছন্দের একটি দল। কিন্তু তাদের অনেকের কাছেই আবার মমতার তৃণমূল ছিল বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় বিপদ, যারা বাংলা থেকে বামদের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে ফেলতে বদ্ধপরিকর ছিল। অনেক বাম সমর্থকের মতে, তাদের কৌশল ছিল ‘এবার রাম, পরে বাম’। অর্থাৎ, এবার আমরা রামকে (বিজেপি) ভোট দিচ্ছি, পরের বার বামদের ভোট দেব। নিউ বারাকপুরের এক সিপিআই (এম) কর্মী বলেন, বিজেপির বিজয়ের মানে এই নয় যে, বাম সমর্থকরা হঠাৎ করে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি গ্রহণ করেছেন বা বাম আদর্শ ত্যাগ করেছেন। বরং এটি এই মুহূর্তে বাম সংগঠনের দুর্বলতাকেই প্রমাণ করে। ভোটাররা বিশ্বাস করেছিলেন যে, বামরা এখনো তৃণমূলকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার মতো শক্তিশালী নয়। অবশ্য শুধু বামদের ভোটেই যে বিজেপি বাংলায় ক্ষমতায় এসেছে, এমনটা বলা অতিরিক্ত সরলীকরণ হবে। নারীদের ভোটের একটি বড় অংশ বিজেপির দিকে যাওয়া এবং ক্ষমতাসীন তৃণমূলের বিরুদ্ধে মনোভাবও বড় ভূমিকা পালন করেছে। নির্বাচনে ৪৫ শতাংশ ভোট পাওয়ার মানে হলো বিজেপির এই বিশাল জয়ের পেছনে সব দলের সমর্থকদের ভূমিকা আছে। বিশেষ করে যেসব আসনে বিজেপি অল্প ব্যবধানে জিতেছে, সেখানে বামদের এই ভোট বড় পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।

নিউ বারাকপুরের সিপিআই (এম) কর্মী কৃষ্ণেন্দু মিত্র বলেন, বাংলার মানুষ তৃণমূলকে হটাতে চেয়েছিল, তাই তারা অন্ধের মতো বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। যাদবপুর, উত্তরপাড়া, দমদম, উত্তর দমদম এবং আসানসোলের মতো আসনগুলো বিজেপির ঝুলিতে যাওয়ার দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। তবে এত কিছুর পরও এবার বামেরা কিছুটা হলেও লাভবান হয়েছে। ২০২১ সালের তুলনায় এবার তারা তাদের ভোটব্যাংকের একটি বড় অংশ ধরে রাখতে পেরেছে। স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য উল্লেখ করেন, কংগ্রেস বাদে বামফ্রন্ট জোট ২০২১ সালে প্রায় ৫.৭ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, যা ২০২৬ সালে বেড়ে প্রায় ৬.৭ শতাংশ হয়েছে। এর অর্থ হলো বামদের মূল সমর্থকগোষ্ঠী এখনো অটুট আছে।

বামদের টিকে থাকার লড়াই : বিশ্লেষকরা বামদের এই কৌশলকে তুলনা করেছেন মিক্সড মার্শাল আর্টস (এমএমএ) যোদ্ধাদের সঙ্গে। একজন যোদ্ধা যেমন প্রতিপক্ষের শ্বাসরোধকারী প্যাঁচ (চোকহোল্ড) থেকে বাঁচতে সে যাত্রায় হার মেনে নেন (ট্যাপ আউট করেন), যাতে পরের দিন আবার লড়াই করার জন্য সুস্থ থাকতে পারেন, বামরাও ঠিক সে কাজটিই করেছে। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের পতন প্রমাণ করে যে বামদের এই কৌশল কাজে লেগেছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্যদের দখল করা পার্টি অফিসগুলো বাম দলগুলো আবার পুনরুদ্ধার করছে।

তাত্ত্বিকভাবে বাম এবং বিজেপি দুই মেরুর দল। তাই প্রশ্ন উঠেছে বামপন্থিরা কেন বিজেপিকে ভোট দিল?  এর প্রথম কারণ হলো টিকে থাকা। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মমতার তৃণমূল প্রতিনিয়ত বাম নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা, পার্টি অফিস দখল এবং অনেককে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য করেছে। এর ফলেই তারা বিজেপির মতো বিকল্প খুঁজতে শুরু করেন। গত ৬ মে সাবেক তৃণমূলের রাজ্যসভা সাংসদ জহর সরকার পিটিআইকে বলেন, ক্ষমতায় আসার পর মমতা কংগ্রেস ও বামসহ অন্যান্য বিরোধী দলকে দুর্বল করার দিকে মনোযোগ দেন। এসব দলের অনেক নেতা তার দলে যোগ দেন অথবা নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য বিজেপিতে চলে যান।

দ্বিতীয় কারণটি হলো যোগ্য বিকল্পের অভাব। ২০১৬ সালে তৃণমূল ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২১১টি আসন জেতে। ওই সময় বাম কর্মীরা বুঝতে পারছিলেন যে, তাদের দল শক্তিশালী কোনো বিরোধী ভূমিকা পালন করতে পারছে না। বামফ্রন্টের শীর্ষ নেতৃত্বও এই পরিবর্তন বুঝতে পেরেছিলেন। ২০১৯ সালে সিপিআইয়ের (এম) তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি স্বীকার করেছিলেন, বাম ভোটাররা বিজেপির দিকে ঝুঁকছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত