১৩ কোটি টাকার প্রকল্প চালু নেই জেলে, নেই ট্রলার

আপডেট : ১২ মে ২০২৬, ০৭:৪৯ এএম

ভোলার মেঘনা নদীর তীরে প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দুটি আধুনিক মৎস্য অবতরণকেন্দ্র এখন অভিভাবকহীন অবস্থায় পড়ে আছে। জেলেদের উন্নয়ন ও মাছ বাজারজাতকরণ সহজ করার উদ্দেশ্যে নির্মিত এ কেন্দ্রগুলোতে নেই কোনো কার্যক্রম, নেই জনবল, এমনকি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও। উল্টা নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম, নিম্নমানের কাজ এবং অপরিকল্পিত স্থান নির্বাচনের অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

বিশ্বব্যাংকের ঋণের অর্থায়নে মৎস্য অধিদপ্তরের ‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্প’-এর আওতায় ভোলা সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের কাঠিরমাথা এবং লালমোহন উপজেলার লর্ড হার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের বুড়িরদোন এলাকায় নির্মাণ করা হয় দুইটি মৎস্য অবতরণকেন্দ্র। এ ছাড়া চরফ্যাশনের চর কচ্ছপিয়ায় নির্মাণ করা হয়েছে সার্ভিল্যান্স চেকপোস্ট, পন্টুন ও চিংড়ি হ্যাচারিসহ আরও কয়েকটি স্থাপনা।

মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অবতরণকেন্দ্র দুইটিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া চেকপোস্ট, পন্টুন ও হ্যাচারিসহ অতিরিক্ত প্রায় ১০ কোটি টাকার কাজও করা হয়েছে। চর জেগে অচল ঘাট, নৌযান ভেড়ানোর সুযোগ নেই।

গত শুক্রবার সরেজমিন ভোলা সদরের কাঠিরমাথা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবতরণকেন্দ্রের সামনেই বিশাল চর জেগে উঠেছে। ফলে বড় কোনো ট্রলার বা মাছধরা নৌযান সেখানে ভিড়তে পারছে না।

স্থানীয় জেলেরা জানান, ওই ঘাটে মাত্র ৩০ থেকে ৪০টি ছোট নৌকা ও ট্রলার আসে। এসব নৌকায় প্রতিদিন ২ থেকে ৩ হাজার টাকার মাছ ধরা পড়ে। এত অল্প পরিসরের মাছ ব্যবসার জন্য বিশাল অবতরণকেন্দ্রের কোনো প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেন তারা।

জেলে নাছির মাঝি বলেন, ‘আমরা নদীর পাড়েই মাছ বিক্রি করি। এখানে এসে আবার টোল দিয়ে মাছ বিক্রি করার দরকার কী?’ স্থানীয় আড়তদার সিরাজ মাল বলেন, ‘যে নিয়মে মাছ বিক্রি হয়, সেই ব্যবস্থাই এখানে নেই। ব্যবসায়ী বা জেলেদের কোনো কাজে আসবে না এ ভবন।’ নির্জন এলাকায় তালাবদ্ধ ভবন, নেই যাতায়াতের রাস্তা। লালমোহনের বুড়িরদোন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বেড়িবাঁধের বাইরে মেঘনার তীরে নির্জন স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে বিশাল আকৃতির দোতলা ভবন। ভবনের চারদিকে জনমানবহীন পরিবেশ। গেটে ঝুলছে বড় বড় তালা।

স্থানীয়রা জানান, ভবনটি নির্মাণের পর থেকে সেখানে কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি। এমনকি যাতায়াতের জন্যও উপযুক্ত রাস্তা নেই। জেলে হেলাল মাঝি বলেন, ‘সরকার বড় ভবন করেছে, কিন্তু এটি জেলেদের কী কাজে আসবে তা আমাদের কেউ জানায়নি।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, চুক্তি অনুযায়ী অবতরণকেন্দ্রগুলোতে জেনারেটর, মিনি হিমাগার, ডিজিটাল স্কেল, বরফ প্যাকেজিং ব্যবস্থা, কমিউনিটি সেন্টারসহ আধুনিক সুবিধা থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেসবের অধিকাংশই নেই।

স্থানীয় ইউপি সদস্য ও জমিদাতা মনির খান বলেন, ‘যেভাবে কাজ করার কথা ছিল, সেভাবে কিছুই হয়নি। জেনারেটর, বরফকল, স্কেল, হিমাগার কিছুই দেয়নি। ভবনের টাইলস উদ্বোধনের আগেই উঠে যাচ্ছে। পানির ট্যাংক লিক করছে। রেলিংও দেওয়া হয়নি।’

জেলা মৎস্য অফিসেও নেই প্রকল্পের তথ্য অবাক করার মতো বিষয় হলো, কোটি টাকার এ প্রকল্প সম্পর্কে ভোলা জেলা মৎস্য অফিসেও পর্যাপ্ত তথ্য নেই।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে গত ১২ মার্চ ভবনগুলো কাগজে কলমে বুঝে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাজের ডিজাইন, যন্ত্রপাতির তালিকা বা নির্মাণসংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্য জেলা অফিসে নেই। তিনি বলেন, ‘এখনো কোনো জনবল দেওয়া হয়নি। ভবন রক্ষণাবেক্ষণেরও ব্যবস্থা নেই। ভবনগুলো চালুর পরিকল্পনা এখনো প্রক্রিয়াধীন।’ তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, জনবল না থাকায় ভবনের মালামাল চুরি বা লুট হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

ঠিকাদার মো. শহিদুল ইসলাম সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘উল্টা অতিরিক্ত টাকা খরচ করেছি’ । তিনি বলেন, বরাদ্দ অনুযায়ী সব কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। বরং সদর উপজেলার প্রকল্পে প্রায় এক কোটি টাকা এবং লালমোহনের প্রকল্পে প্রায় তিন কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত ব্যয়ের কাগজপত্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। মৎস্য বিভাগের একাধিক প্রকৌশলী কাজের তদারকি করেছেন। স্থান নির্ধারণ করেছেন প্রকৌশলীরাই।’

এ বিষয়ে উপপ্রকল্প পরিচালক মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য স্থানীয় জেলেদের জীবনমান উন্নয়ন। স্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে জমি ও টেকসই বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে। এখন স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করা গেলে কেন্দ্রগুলো চালু করা সম্ভব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত