তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে পৌঁছেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় ট্রাম্পকে বহনকারী বিশেষ বিমান ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’ চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে অবতরণ করে। লাল গালিচা বিছিয়ে ট্রাম্পকে সংবর্ধনা দিয়েছে বেইজিং। বিমানবন্দরে ট্রাম্পকে স্বাগত জানান চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেং। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রায় ৩০০ চীনা তরুণ-তরুণী অংশ নেয়। এ সময় একটি সামরিক গার্ড অব অনার এবং সামরিক ব্যান্ড দল ট্রাম্পকে অভিবাদন জানায়। হোয়াইট হাউসের তথ্যানুযায়ী, অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ওয়াশিংটনে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত শি ফেং, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী ভাইস মিনিস্টার মা ঝাওক্সু ও বেইজিংয়ে নিযুক্ত মার্কিন দূত ডেভিড পারডিউ। সফরে ইরান যুদ্ধ, বাণিজ্য ও তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে দুই নেতার মধ্যে আলোচনার কথা রয়েছে। প্রায় এক দশকের মধ্যে এটিই যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্টের প্রথম চীন সফর। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের কারণে কয়েক সপ্তাহ বিলম্বের পর এ সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
গতকাল বুধবার অবতরণের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কোনো জনসমক্ষে অনুষ্ঠান রাখা হয়নি। ট্রাম্পের সফরের মূল অংশ শুরু হবে আজ বৃহস্পতিবার থেকে। জানা গেছে, আজ ও আগামীকাল শুক্রবার শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার কয়েক দফায় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। দুই প্রভাবশালী নেতার মধ্যে আলোচনা মূলত বাণিজ্য সম্পর্ককে ঘিরেই হবে। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বিশ্বের প্রধান দুই পরাশক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্ব নিয়ে দুই দেশকে প্রায়ই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে দেখা যায়। অথচ ২৫ বছর আগে প্রায় সব বড় সূচকেই যুক্তরাষ্ট্র চীনের তুলনায় অনেক এগিয়ে ছিল। এখন চীনকে বিশ্বের ‘কারখানা’ হিসেবে দেখা হয় এবং বহু ক্ষেত্রেই তারা পশ্চিমা প্রতিদ্বন্দ্বীদের ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এবারের সফরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো তার সফরসঙ্গীরা। যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর একঝাঁক শীর্ষ নির্বাহী এ সফরে তার সঙ্গী হয়েছেন। এ তালিকায় রয়েছেন অ্যাপলের টিম কুক, টেসলা ও স্পেসএক্সের কর্ণধার ইলন মাস্ক এবং ব্ল্যাকরকের ল্যারি ফিঙ্ক। এ ছাড়া মেটার ভাইস চেয়ারম্যান ডিনা পাওয়েল ম্যাককর্মিক, ভিসার প্রধান নির্বাহী রায়ান ম্যাকলনার্নি, বোয়িংয়ের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কেলি ওর্টবার্গ, ব্ল্যাকস্টোনের প্রধান নির্বাহী স্টিফেন শোয়ার্জম্যানসহ আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও রয়েছেন। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বিবিসিকে জানান, ট্রাম্পের এই সফরে ডজনেরও বেশি টেক কোম্পানির শীর্ষ কর্তকর্তারা রয়েছেন, যা দুই দেশের বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান ইরান যুদ্ধ এবং দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য উত্তেজনা নিরসনে এই সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। যদিও ইরান ইস্যুতে শি জিনপিংয়ের সাহায্যের দরকার নেই বলে মন্তব্য করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাশাপাশি তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি নিয়ে বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের যে আপত্তি, তা নিয়েও দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে আলোচনা হতে পারে। ট্রাম্পের এ সফরের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রকে তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং। গতকাল বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের তাইওয়ানবিষয়ক দপ্তরের রাষ্ট্রীয় কাউন্সিলের মুখপাত্র চাং হান বলেন, শান্তিপূর্ণ পুনর্মিলন এবং ‘এক দেশ, দুই ব্যবস্থা’ নীতি জাতীয় পুনর্মিলন অর্জনের সর্বোত্তম পথ। এর মাধ্যমে তাইওয়ানের মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও আত্মপরিচয়ের অনুভূতি আরও দৃঢ় হবে।
মুখপাত্র আরও বলেন, এতে তাইওয়ানের মানুষের মধ্যে থাকা ‘অস্পষ্ট সাংস্কৃতিক পরিচয়’ ও ‘ইতিহাস সম্পর্কে বিভ্রান্তি’ দূর হবে। তিনি জানান, শান্তিপূর্ণ পুনর্মিলন তাইওয়ানের সাংস্কৃতিক শিল্প খাতের জন্যও বড় সুযোগ তৈরি করবে। তাইওয়ানের চলচ্চিত্র, টেলিভিশন প্রযোজনা, সংগীত ও প্রকাশনা খাত মূল ভূখণ্ড চীনের বিশাল বাজারে সহজে প্রবেশাধিকার পাবে এবং নীতি ও সম্পদের আরও বেশি সহায়তা পাবে বলেও জানান তিনি। মুখপাত্র বলেন, পুনর্মিলনের মাধ্যমে তাইওয়ানের সমাজ দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন ও আদর্শিক সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে।
