বৃটেনের প্রভাবশীল দৈনিক গার্ডিয়ানে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ব্রাজিলের কোচ কথা বলেছেন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দল' পরিচালনার অভিজ্ঞতা, ভিনিসিউস জুনিয়রের সেরাটা বের করে আনা এবং রিয়াল মাদ্রিদ থেকে তিনি কী শিখেছেন তা নিয়ে।
কার্লো আনচেলত্তি কি একজন উচ্চাভিলাষী মানুষ? ৬৬ বছর বয়সী এই ইতালিয়ান কোচ আরাম করে হেলান দিয়ে হাসলেন। “আমি? আমি উচ্চাভিলাষী নই। কেন? আপনি কেন এমন প্রশ্ন করছেন?” প্রশ্নের কারণটা সহজ: পাঁচটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জয় এবং ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও স্পেনে লিগ শিরোপাধারী তিনি ইতিহাসের অন্যতম সফল ম্যানেজার। কিন্তু তবুও তিনি আরও চান। গত মে মাসে তাকে ব্রাজিলের প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল একটিই লক্ষ্য নিয়ে: বিশ্বকাপ জয়।
“আমি জেতার নেশায় মগ্ন নই,” আনচেলত্তি বলেন। “ফুটবল আমাকে যে মুহূর্তগুলো দিয়েছে তা উপভোগ করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা আমার আছে। আমি বিশ্বকাপ জেতার জন্য পাগল নই, তবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার এই মুহূর্তটি উপভোগ করার আনন্দ ও আবেগ আমার আছে।”
খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে খেললেও কোচ হিসেবে এবারই প্রথম কোনো দলের দায়িত্ব নিয়ে টুর্নামেন্টে যাচ্ছেন আনচেলত্তি। তার কাজ হলো ব্রাজিলকে আবারও বিশ্বের শীর্ষে ফিরিয়ে আনা এবং ২০০২ সাল থেকে চলা খরা কাটানো। আনচেলত্তিকে অবশ্য বিচলিত মনে হচ্ছে না। খেলোয়াড় হিসেবে ১৬ বছর এবং কোচ হিসেবে ৩১ বছর—মোট ৪৭ বছর ফুটবলের শীর্ষে থেকেও তার কাজের প্রতি উৎসাহ বিন্দুমাত্র কমেনি।
তিনি বলেন, “ফুটবল ছাড়া আমি বাঁচতে পারতাম না। যদি মাঠে না থাকি, তবে ভক্ত হিসেবে ম্যাচ দেখব। আমার কাছে টিভিতে খেলা দেখাটা কাজ নয়, এটা আনন্দ। আমি সিনেমা খুব পছন্দ করি। আমার কাছে ফুটবল দেখা অনেকটা সিনেমা দেখার আনন্দের মতো। যেদিন ফুটবল থেকে অবসর নেব, সেদিনও একইভাবে খেলা দেখব।”
কাকা, টনি ক্রুস, গ্যারেথ বেল বা ভিনিসিউস জুনিয়রের মতো অনেক খেলোয়াড়ই তাকে তাদের দেখা সেরা কোচ মনে করেন। এর রহস্য কী? আনচেলত্তি হেসে বললেন, “আমি সত্যিই জানি না। হয়তো আমার আচরণ বা খেলোয়াড়দের প্রতি আমার সম্মান দেখানোর ধরণ। আমি ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলাকে অনেক গুরুত্ব দেই। একজন ম্যানেজারের কাজ খুব কঠিন কারণ তাকে অনেক কিছু সামলাতে হয়—খেলোয়াড়, ক্লাব, সংবাদমাধ্যম, ভক্ত। তবে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং এবং গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা।”
তার অর্জিত ট্রফি থাকা সত্ত্বেও অনেকে তাকে কেবল ‘ম্যান-ম্যানেজমেন্ট কোচ’ (মানুষ সামলানোর কোচ) বলে অভিহিত করেন, যার কৌশলগত জ্ঞান হয়তো অতটা প্রখর নয়। আনচেলত্তি এসবে কান দেন না। “আমি শুধু খেলোয়াড়দের সাথে সুসম্পর্কের কারণে শিরোপা জিতি না। সুসম্পর্ক খেলোয়াড়দের কাছ থেকে সর্বোচ্চটা বের করে আনতে সাহায্য করে। মানুষ আমাকে ভালো ট্যাকটিশিয়ান বলুক বা না বলুক, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি জানি আমি ফুটবলের সব দিক খুব ভালো বুঝি।”
২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত ব্রাজিলের সাথে চুক্তি বাড়াতে যাচ্ছেন আনচেলত্তি, তখন তার বয়স হবে ৭০। তিনি বলেন, “ফুটবল প্রতিনিয়ত পাল্টাচ্ছে। আমি খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। আজকের ফুটবল অনেক বেশি বিশ্লেষণধর্মী, অনেক বেশি গতিশীল এবং শারীরিক। নতুন প্রজন্মের কোচরা রক্ষণভাগের চেয়ে আক্রমণে বেশি মনোযোগ দেন।”
ব্রাজিল দলের দায়িত্বে অল্প সময় থাকলেও তিনি মনে করেন দেশটির নাড়ি নক্ষত্র তিনি বোঝেন, কারণ ক্যারিয়ারে তিনি ৪০ জনেরও বেশি ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়ের সাথে কাজ করেছেন। “আমি ব্রাজিলিয়ানদের চেতনা খুব পছন্দ করি। হলুদ জার্সির প্রতি তাদের বিশেষ ভালোবাসা আছে। ব্রাজিল এখনো তার নিজস্ব সংস্কৃতি, পরিবার এবং ধর্মের মূল্যবোধ ধরে রেখেছে—যা ইউরোপ হারিয়ে ফেলেছে। আমি রিও ডি জেনিরোর সৌন্দর্য আর মানুষের শক্তি খুব পছন্দ করি।”
আনচেলত্তির কাছে ধর্মের গুরুত্ব অনেক। ইতালির মতো ব্রাজিলের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি ক্যাথলিক। তিনি বলেন, “ধর্ম আমাকে জীবনে কীভাবে চলতে হয় এবং অন্যদের সম্মান করতে হয় তা শিখিয়েছে। আমি ক্যাথলিক এবং এটি আমাকে একজন ভালো মানুষ হতে সাহায্য করেছে।” চোটের সমস্যা কমানোর জন্য কি তিনি প্রার্থনা করেন? হেসে বললেন, “হ্যাঁ, এটা একটা দুশ্চিন্তার বিষয়। বিশ্বকাপের আগে আর কোনো সমস্যা না হোক এটাই চাই।”
ইতিমধ্যেই এডার মিলিতাও এবং রদ্রিগোকে হারিয়েছে ব্রাজিল, এস্তেভাওকে নিয়েও সংশয় আছে। ১০ ম্যাচে ৫ জয়, ২ ড্র এবং ৩ হার নিয়ে আনচেলত্তি এখন তার সেরা একাদশ সাজানোর চেষ্টা করছেন। রিয়াল মাদ্রিদে যেভাবে ভিনিসিউসকে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় বানিয়েছিলেন, ব্রাজিলেও তেমনটা করার চেষ্টা করছেন তিনি। ভিনিসিউস ব্রাজিলের হয়ে ৪৭ ম্যাচে মাত্র ৮টি গোল করেছেন।
ভিনিসিউস সম্পর্কে তিনি বলেন, “ব্রাজিলের হয়ে সে যে দায়িত্ব বহন করে তা অনেক সময় তার জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের কাজ হলো সেই ভার কিছুটা কমিয়ে দেওয়া যাতে সে আনন্দ নিয়ে খেলতে পারে। আমি তাকে রিয়াল মাদ্রিদের মতোই দেখি—একজন অসাধারণ খেলোয়াড় যে একাই ম্যাচ জিতিয়ে দিতে পারে। তবে আমরা কেবল একজনের ওপর নির্ভর করতে পারি না, আমাদের দল হিসেবে ভাবতে হবে।”
ব্রাজিলে এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় নেইমার। ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে জাতীয় দলের হয়ে খেলেননি। আগামী ১৮ মে বিশ্বকাপের স্কোয়াড ঘোষণা করবেন আনচেলত্তি। নেইমারকে রাখা হবে কি না—এই প্রশ্নে তিনি সাফ জানালেন: “নেইমারের ডাক পাওয়া কেবল তার নিজের ওপর নির্ভর করছে। সে মাঠে কী দেখাচ্ছে সেটাই আসল। নেইমারের প্রতিভা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই, আমাদের শুধু তার শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন করতে হবে। এটা তার ওপর নির্ভর করছে, আমার ওপর নয়।”
সাবেক চেলসি তারকা ৪১ বছর বয়সী থিয়াগো সিলভাও দলে থাকার আশা করছেন। আনচেলত্তি নিশ্চিত করেছেন যে সিলভা তার নজরে আছেন। এছাড়া অ্যালিসন, ক্যাসেমিরো, মার্কুইনহোস এবং রাফিনহার মতো অভিজ্ঞ নেতাদের ওপরও তার ভরসা আছে।
কুকুরপ্রেমী আনচেলত্তি ফুটবলের চাপ থেকে মুক্তি পান তার পোষ্যদের কাছে। “আমার তিনটি কুকুর আছে যারা এখন কানাডায়। কুকুর মানুষের চেয়েও বেশি অনুগত। আপনি হারলেন না জিতলেন তাতে কুকুরের কিছু যায় আসে না। আপনি বাড়ি ফিরেছেন—তাদের কাছে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
সবশেষে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে মরক্কো, হাইতি এবং স্কটল্যান্ডের মুখোমুখি হবে ব্রাজিল। শিরোপা জিততে কী লাগবে? আনচেলত্তি আত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন, “প্রতিভা। আমার দলে প্রচুর প্রতিভা আছে। আর ২৪ বছর পর আবারও জেতার জন্য এই দেশটির যে অনুপ্রেরণা, তা বিশাল। আমি নিশ্চিত আমাদের বিশ্বকাপটা দুর্দান্ত কাটবে।”
'তুমি বিশ্বকাপে যাচ্ছ না' কটুক্তির জবাবে নেইমার যা বললেন
আলাভেসকে রেলিগেশন এড়াতে 'সাহায্য' করলো বার্সেলোনা!
মেসির জোড়া ও অ্যাসিস্টে ৮ গোলের থ্রিলার জয় মায়ামির