ঝিনাইদহে ছয় উপজেলায় এবার পেঁয়াজ চাষে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছেন শত শত প্রান্তিক চাষি। চাষিদের অভিযোগ, বীজ ব্যবসায়ীদের প্রতারণার কারণে নিম্নমানের বীজ ব্যবহার করে এখন বিপর্যয়ের মুখে পড়ছেন। পেঁয়াজের ফলন বেশি হলেও মান ভালো হয়নি। কাক্সিক্ষত দাম পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কোনো কোনো চাষি পেঁয়াজ পানিতে ফেলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
ঝিনাইদহ জেলার সদর, কালীগঞ্জ, শৈলকুপা, হরিণাকু-ু, কোটচাঁদপুর ও মহেশপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এবার পেঁয়াজের আবাদ হয়েছিল। ভালো লাভের আশায় কৃষকরা স্থানীয় ডিলারদের কাছ থেকে ভারতীয় জাতের বীজ কিনে চাষ করেন। কৃষকদের অভিযোগ, মেহেরপুর, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঝিনাইদহ ও শৈলকুপার অসাধু বীজ ব্যবসায়ী প্রতারক চক্র নিম্নমানের ভেজাল বীজ এনে প্রান্তিক চাষিদের কাছে বিক্রি করছে। সেসব বীজে সুখসাগর, লালতীর বা দেশীয় ভালো মানের পেঁয়াজ না হয়ে ভারতীয় নিম্নমানের নাসিক জাতের পেঁয়াজ হয়েছে। যা সংরক্ষণযোগ্য নয়, দ্রুত পচনশীল।
পাঁচ দিনও সংরক্ষণ করা যায় না। এসব পেঁয়াজ বিঘা প্রতি দেড়শ মনেরও বেশি ফলন হলেও কাক্সিক্ষত দাম পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিমণ ৩০০ থেকে ৪০০ টাকাও বিক্রি হচ্ছে না।
শৈলকুপা বাজারের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী আলমগীর অরণ্য জানান, অনেক প্রান্তিক চাষির সব পেঁয়াজই এভাবে পচন ধরছে, তারা বাজারে আনলেও ব্যবসায়ী, পাইকার সেসব পেঁয়াজ কিনছেন না। তিনি বলেন, অনেক কৃষক ক্ষোভে বাজারেই ঢেলে খালি বস্তা হাতে নিয়ে ফিরছেন বাড়িতে।
শৈলকুপা উপজেলার চরসুন্ধা গ্রামের দুলাল হোসেন জানান, বীজ কেনার সময় ডিলার আনোয়ার হোসেন বলেছিলেন পেঁয়াজের ফলন ভালো হবে। দীর্ঘদিন সংরক্ষণও করা যাব, পচবে না। কিন্তু পেঁয়াজের ফলন ভালো হলেও তা পচে যাচ্ছে। বিশেষ করে বড় পেঁয়াজগুলোতে বেশি পচন ধরেছে।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কৃষক ফিরোজ আহমেদ জানান, এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করতে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু মান এত খারাপ যে শ্রমিকের খরচও উঠছে না।
স্থানীয় বাজারগুলোতেও পেঁয়াজের দাম অনেক কম। ভালো মানের পেঁয়াজের কেজি ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হলেও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পেঁয়াজ কেউ কিনতে চাইছে না।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিতভাবে নিম্নমানের বীজ বাজারে প্রবেশ করায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কৃষকদের সচেতনতার অভাব এবং বীজ মনিটরিং দুর্বল হওয়ায়
কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. কামরুজ্জামান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কিছু কৃষকের বীজের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তরা আবেদন করলে তাদের বীজের টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করা হবে। পেঁয়াজ পচে যাওয়ার পেছনে কিছু কারণ রয়েছে বলেও তিনি জানান। তার মতে, ভারতীয় এসব নিম্নমানের পেঁয়াজে ফলন বেশি পেতে অতিমাত্রায় সার ব্যবহার করেন কৃষকরা, আবার পেঁয়াজ জমি থেকে তোলার আগেই বৃষ্টির কবলে পড়ে যাওয়ার কারণে এ বছর পেঁয়াজে খুব সহজেই পচন ধরছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পেঁয়াজ উৎপাদিত এলাকা হিসেবে খ্যাত শৈলকুপায় চলতি বছর ১২ হাজার ৮৩৬ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৮০৫ হেক্টর বেশি। হেক্টর প্রতি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০.২টন, তবে তা বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি হেক্টরে উৎপাদন হয়েছে ২০.৭ টন। এবার মোট উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৬৫ হাজার টনের বেশি পেঁয়াজ।
