আমলনামা দেখে মানুষের অবস্থা যেমন হবে

আপডেট : ১৬ মে ২০২৬, ১২:৫৫ এএম

আমাদের সব কাজ লিপিবদ্ধ হচ্ছে। পরকালে আমাদের দুনিয়ার কাজের সবচেয়ে বড় দলিল হবে আমলনামা। এটাই হবে মানুষের জীবনের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস, যা একদিন সবার সামনে খুলে দেওয়া হবে। এটা দেখে নেককাররা আনন্দিত হবে এবং অপরাধীরা ভীতসন্ত্রস্ত হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি প্রত্যেক মানুষের কর্মকে তার ঘাড়ে সংযুক্ত করে দিয়েছি এবং কেয়ামতের দিন তার জন্য আমি বের করব একটি কিতাব, যা সে পাবে উন্মুক্ত।’ (সুরা বনি ইসরাইল ১৩)

এই আয়াত মানুষ গভীরভাবে নাড়া দেয়। এখানে ঘাড়ের সঙ্গে লেগে থাকার অর্থ হলো, আমাদের কর্ম আমাদের থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হয় না। এটি কোনো বাহ্যিক বোঝা নয়, বরং আমাদের অস্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কেয়ামতের ময়দানে যখন এই কিতাবটি উন্মুক্ত করা হবে, তখন সবাই বিস্ময়ের সঙ্গে দেখবে তার দুনিয়ার জীবনের কর্মকাণ্ড। সেদিন নিজের কৃতকর্মই হবে নিজের সবচেয়ে বড় সাক্ষী।

কোরআনে আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমলনামা রাখা হবে। তখন তুমি অপরাধীদের দেখতে পাবে ভীত, তাতে যা রয়েছে সেটার কারণে। আর তারা বলবে, হায় ধ্বংস আমাদের! কী হলো এ কিতাবের! তা ছোট-বড় কিছুই ছাড়ে না, শুধু সংরক্ষণ করে। তারা যা করেছে, তা হাজির পাবে। আর তোমার রব কারও প্রতি জুলুম করেন না।’ (সুরা কাহাফ ৪৯)

এই দৃশ্য মানবচেতনায় এক গভীর শিহরণ জাগায়। মানুষ তখন বুঝতে পারে, যে কাজগুলোকে সে তুচ্ছ ভেবেছিল, যে কথাগুলো গুরুত্বহীন মনে করেছিল, সবই সেখানে আছে। নির্জনে বলা একটি কটু কথা বা চোখের একটি পলকও সেখানে নথিবদ্ধ। কোনো কিছুই উপেক্ষিত হয়নি। আমলনামা হবে এমন এক নিখুঁত দলিল, যেখানে গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু সমানভাবে সংরক্ষিত।

পাপ-পুণ্যের হিসাব-নিকাশের এই নিখুঁত ও কঠোর চিত্র দেখে শঙ্কিত হওয়া স্বাভাবিক। ইরশাদ হয়েছে, ‘আজ কারও প্রতি কোনো জুলুম করা হবে না এবং তোমাদের শুধু তোমাদের কাজেরই প্রতিদান দেওয়া হবে।’ (সুরা ইয়াসিন ৫৪)

এই আয়তে আল্লাহ জানিয়েছেন, মহান রবের দরবারে কোনো ব্যক্তি অবিচারের শিকার হবে না। কারও পুণ্যকে অবমূল্যায়ন করা হবে না, আবার কারও ওপর অন্যের পাপের দায়ভার চাপানো হবে না। আমরা ইহকালে যা বপন করেছি, পরকালে কেবল তারই ফসল পাব। আল্লাহর বিচারব্যবস্থা কেবল দণ্ড নয়, বরং এক পরম ইনসাফের বাস্তবায়ন।

মানুষ দুনিয়াতে অনেক কিছু গোপন রাখতে পারে, মানুষের চোখ ফাঁকি দিতে পারে, সমাজকে ভুল বোঝাতে পারে। কিন্তু আমলনামার সামনে সব মুখোশ খুলে যাবে। অন্তরের গোপন ইচ্ছা, লুকানো পাপ, অপ্রকাশিত নেক আমল সবই সেখানে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

আমলনামা মানুষের জীবনের সেই আয়না, যেখানে তার প্রকৃত চেহারা ফুটে উঠবে। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত হিসাবের মধ্যে রয়েছে। তাই সচেতন মানুষের কাজ হলো, এমন জীবনযাপন করা, যাতে সেই দিন তার আমলনামা লজ্জার কারণ না হয়ে গৌরবের কারণ হয়।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত