মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটে পাকিস্তানকে ধূলিসাৎ করে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা এখন আত্মবিশ্বাসের সপ্তম স্বর্গে। চেনা কন্ডিশনে রক্ষণাত্মক ক্রিকেটের খোলস ছেড়ে বাংলাদেশ এখন খেলছে আগ্রাসী ঘরানার আধুনিক টেস্ট ক্রিকেট। চিরচেনা প্রতিপক্ষ পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা তিন টেস্ট জয়ের অসামান্য গৌরব বুকে নিয়ে শনিবার থেকে চায়ের দেশ সিলেটে দ্বিতীয় টেস্টে মুখোমুখি হচ্ছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। একদিকে বাংলাদেশের সামনে সিরিজ জয়ের সোনালি সুযোগ, অন্যদিকে হোয়াইটওয়াশ এড়ানোর মরণপণ লড়াইয়ে নামছে পাকিস্তান। তবে দুদলের মাঠের লড়াইয়ের চেয়েও বড় প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে সিলেটের বৈরী আবহাওয়া।
মে মাসের এই তপ্ত সময়ে বাংলাদেশের আকাশজুড়ে এখন বর্ষার আবহ। আবহাওয়ার পূর্বাভাস ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে কিছুটা শঙ্কার জন্ম দিচ্ছে, কারণ সিলেট টেস্টের প্রতিটি দিনই জাঁকিয়ে বসতে পারে বৃষ্টি। ম্যাচের প্রথম দিন অর্থাৎ শনিবার সকাল থেকেই আকাশ থাকবে মেঘে ঢাকা (প্রায় ৯৫ শতাংশ মেঘাচ্ছন্ন)। বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ থাকবে ৭৮ শতাংশের কাছাকাছি, যা ভোরের সেশনে পেসারদের জন্য উইকেটে সুইং ও বাড়তি মুভমেন্টের বড় অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
তবে প্রকৃতির এই চোখ রাঙানি নিয়ে মোটেও বিচলিত নন স্বাগতিক শিবিরের সবচেয়ে অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম। সংবাদ সম্মেলনে ইতিবাচক সুর টেনে তিনি বলেন, ‘উইকেটের চেয়ে এখন আবহাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সিলেটের ড্রেনেজ সিস্টেম বিশ্বমানের। অতি সম্প্রতি এখানে বিসিএলের ম্যাচে রাতে মুষলধারে বৃষ্টির পরও পরদিন সকাল সাড়ে ৯টায় খেলা শুরু করা সম্ভব হয়েছে। খেলা অন অ্যান্ড অফ (আসা-যাওয়া) হলেও আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে একটি পরিষ্কার ফলাফল বের করে আনা সম্ভব।’
মিরপুর টেস্টের শেষ সেশনে পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইন-আপকে যে এক্সপ্রেস গতিতে তছনছ করেছিলেন তরুণ তুর্কি নাহিদ রানা, তার রেশ এখনো কাটেনি। শেষ দুই মাসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৩টি ফাইফার (ইনিংসে ৫ উইকেট) শিকার করা রানা এখন প্রতিপক্ষের জন্য এক আতঙ্কের নাম। ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতি ধরে রেখে টানা বল করার যে বিরল সক্ষমতা তিনি দেখিয়েছেন, তা সিলেটের আর্দ্র কন্ডিশনে আরও বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। যদিও তার ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট নিয়ে বিশ্রামের গুঞ্জন ছিল, তবে টিম ম্যানেজমেন্ট তাকে এই সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে খেলাতেই বেশি আগ্রহী।
অন্য দিকে, বাঁ হাঁটুর চোট কাটিয়ে পাকিস্তান শিবিরে স্বস্তি ফিরিয়েছে তাদের সবচেয়ে বড় ব্যাটিং স্তম্ভ বাবর আজম। সাদা বলের ক্রিকেটে বাবর সম্প্রতি ফর্মে ফেরার ইঙ্গিত দিলেও, লাল বলের আভিজাত্যের লড়াইয়ে ২০২৪ সাল থেকে তার ব্যাট কথা বলছে না (গড় ২৬-এর নিচে)। তবে বাবর আজমের মতো বিশ্বমানের ব্যাটারের অন্তর্ভুক্তি যে পাকিস্তানকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে এগিয়ে রাখবে, তা মানছেন মুশফিকও। তবে একই সঙ্গে হুঙ্কার দিয়ে রেখেছেন এই তিনি, ‘বাবরের ফেরা ওদের জন্য অবশ্যই বুস্ট আপ। তবে আমরা যখন পাকিস্তানের মাটিতে গিয়ে ওদের হারিয়েছিলাম, তখনো বাবর দলে ছিল। তাকে কীভাবে দ্রুত সাজঘরে ফেরাতে হবে, সেই নিখুঁত পরিকল্পনা আমাদের আছে। মাঠে তার সঠিক বাস্তবায়ন করতে পারলে তাকে ও পুরো পাকিস্তান দলকে আমরা চড়া চাপে ফেলতে পারব।’
বাংলাদেশ দলের শক্তির সবচেয়ে বড় জায়গা হলো দলের ভারসাম্য। সবুজ উইকেটে যেমন তারা নাহিদ রানা, তাসকিন আহমেদ কিংবা এবাদত হোসেনদের মতো গতি তারকাদের খেলাতে পারছে, তেমনি স্পিন বিভাগে তাইজুল ইসলামের সঙ্গে অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজের উপস্থিতি দলকে অনন্য এক পূর্ণতা দিয়েছে। তবে স্বাগতিক শিবিরে কিছুটা দুশ্চিন্তা তৈরি করেছে ওপেনার মাহমুদুল হাসান জয়ের হাতের চোট। অনুশীলনে তার হাতে ব্যান্ডেজ দেখা গেছে, ফলে ব্যাকআপ ওপেনার হিসেবে জাকির হাসান কিংবা তানজিদ হাসান তামিমকে একাদশে দেখা যেতে পারে। পেসারদের ক্লান্তি দূর করতে তাসকিনের জায়গায় শরীফুল ইসলামকে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল।
বাবর আজমের প্রত্যাবর্তনের কারণে কপাল পুড়তে পারে ওপেনার ইমাম-উল-হকের। সেক্ষেত্রে অধিনায়ক শান মাসুদ নিজেই ইনিংসের সূচনা করতে পারেন আজান আওয়াইসের সঙ্গে। অফ-ফর্মে থাকা তারকা পেসার শাহিন শাহ আফ্রিদিকে বাদ দিয়ে খুররাম শাহজাদকে খেলানোর জোরালো ইঙ্গিত রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের বামহাতি ব্যাটারদের রুখতে নোমান আলির জায়গায় অভিজ্ঞ অফ-স্পিনার সাজিদ খানকে খেলানোর পরিকল্পনা করছে পাকিস্তান।
এই টেস্ট জিতলে ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম দল হিসেবে পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা ৪টি টেস্ট জয়ের অনন্য কীর্তি গড়বে বাংলাদেশ। বর্তমানে জিম্বাবুয়ের সঙ্গে যৌথভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে টানা ৩টি টেস্ট জয়ের রেকর্ড রয়েছে টাইগারদের।
