সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের একটি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। দুবাইয়ের একটি আদালত থেকে গত সোমবার জামিন পেয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কারামুক্ত হন তিনি। তবে তার কারামুক্তির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য নেই পুলিশ সদর দপ্তর এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে।
দুদিন আগে তিনি মুক্ত হলেও বিষয়টি গতকাল প্রকাশ্যে আসে। জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো প্রত্যর্পণসংক্রান্ত নথি এবং আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে দুবাইয়ের আদালতে উভয় পক্ষের শুনানি হয়। পরে শর্তসাপেক্ষে বেনজীরকে জামিন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় আদালত।
দুবাই পুলিশের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানায়, বেনজীর গত ২৭ জুলাই আদালত থেকে জামিন পান। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের উম্ম হুরাইর-১ রিয়াদ স্ট্রিটের ফৌজদারি আদালতে (প্রাথমিক বিচারিক আদালত) জামিন আবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। জামিনের শর্ত হিসেবে অভিযুক্তের পাসপোর্টের পাশাপাশি তার স্পন্সর স্থানীয় আরবির ও নিকটাত্মীয়ের পাসপোর্টও আদালতের জিম্মায় রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়মিত হাজিরা দিতে হবে বেনজীর আহমেদকে। এসব শর্ত মেনে চলার ভিত্তিতে তার জামিন বহাল থাকবে।
আদালতের আদেশের পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আল আওবির কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্ত হন বেনজীর আহমেদ। এই কারাগারের অবস্থান দুবাইয়ের আল রুওয়াইয়াহ থার্ডের আল আওবির সড়কে। সূত্র জানায়, দুবাইয়ে জামিনে কারামুক্ত হয়ে গেছেন বেনজীর মুক্তির সময় বেনজীর আহমেদের কয়েকজন আত্মীয় ও বন্ধু উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে, পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, তারা বেনজীরের মুক্তির বিষয়ে দুবাই কর্তৃপক্ষ বা ইন্টারপোলের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য পাননি। এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। তবে রবিবার দুবাইয়ে সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় যোগাযোগ বিলম্বিত হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেনজীর আহমেদের মুক্তি বা তার ছাড়া পাওয়ার বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। এ বিষয়ে দুবাই পুলিশের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।’
দুবাইয়ে বেনজীর আহমেদের মুক্তি পাওয়ার খবরের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছেও আনুষ্ঠানিক তথ্য বা কাগজপত্র আসেনি। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদক কার্যালয়ে গতকাল বিকেলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সংস্থার মহাপরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী এ তথ্য জানিয়ে বলেন, ‘সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের মুক্তির বিষয়টি আমরা সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে জেনেছি। তবে এ বিষয়ে দুদকের কাছে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য বা কাগজপত্র আসেনি। আইনগতভাবে আমাদের পক্ষ থেকে যা যা করার প্রয়োজন, দুদক তা করবে।’
বেনজীর আহমেদের মামলার বিষয়ে দুদকের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মহাপরিচালক দাবি করেন, তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়ায় দুদকের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের ঘাটতি ছিল না।
অন্যদিকে গতকাল রাজশাহীতে একটি অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ দুবাই আদালত থেকে শর্ত সাপেক্ষে জামিন পেয়েছেন বলে তিনি শুনেছেন। তার জামিন আদেশ বাতিলের জন্য বাংলাদেশ সরকার দুবাইয়ে ল ফার্ম নিয়োগ করেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘কয়েকদিন আগেই আমরা ল ফার্ম নিয়োগ করেছি। তাদের ইনস্ট্রাকশন (নির্দেশনা) দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা বেইল ক্যানসিলেশনের জন্য পার্সিউ করে। আমি খবর পেয়েছি, তাকে (বেনজীর) অন কন্ডিশন, ইউএই লিভ না করার শর্তে বেইল দিয়েছে।’ বাংলাদেশ এখন কী করবে, এমন প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ল ফার্ম নিয়োগ করেছি। আমাদের চেষ্টা আমরা করছি। আশা করছি, বেইল ক্যানসেল করতে পারব এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে তাকে ফেরত আনতে পারব।’
এ ছাড়া গতকাল ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরকারের যোগাযোগ চলছে এবং কাগজপত্র আদান-প্রদান হয়েছে। আমিরাত সরকার স্বরাষ্ট্র এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে কিছু তথ্য নির্দিষ্ট করে জানতে চেয়েছে। সেগুলো দেওয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, শিগগির অভিযুক্ত আসামিকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করা যাবে। তিনি বলেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইন অনুযায়ী তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে। আমাদের সরকার তাদের সঙ্গে কথা বলবে। আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের সঙ্গে কথা বলবে।’
বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি ছিলেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র্যাবের তখনকার সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। তাদের মধ্যে বেনজীর আহমেদও ছিলেন। ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কয়েক মাস আগে বেনজীর ও তার পরিবারের বিপুল সম্পদের তথ্য সামনে আসে। এরপর তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামে দুদক। ওই সময় তিনি দেশ ছাড়েন। পরে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয় এবং আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার আদেশ দেয় আদালত। এর আগে ৭৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেনজীর, তার স্ত্রী জীশান মীর্জা এবং দুই মেয়ের বিরুদ্ধে চারটি মামলা করে দুদক। মামলাগুলোতে তার বিরুদ্ধে ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ২ কোটি ৬২ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়। স্ত্রী জীশান মীর্জার বিরুদ্ধে ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ১৬ কোটি ১ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ রয়েছে।
