লিটনের মাস্টারক্লাস

আপডেট : ১৭ মে ২০২৬, ০৭:৫০ এএম

সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পাকিস্তানি বোলারদের আগুনে বোলিংয়ের মুখে যখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল বাংলাদেশ, ঠিক তখনই ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হলেন লিটন দাস। ‘একক বীরত্বে’ টেনে নিলেন দলকে। টেল এন্ডারদের আগলে রেখে খেললেন ১৫৯ বলে ১২৬ রানের এক অতিমানবীয় ইনিংস। ধারাভাষ্য কক্ষে থাকা রমিজ রাজা লিটনের এই প্রতিরোধকে এক শব্দে আখ্যা দিয়েছেন ‘মাস্টারক্লাস’। লিটনের এই মহাকাব্যিক সেঞ্চুরিতে ভর করেই প্রথম ইনিংসে ২৭৮ রানের লড়াই করার মতো পুঁজি পেয়েছে বাংলাদেশ।

বৃষ্টির চোখ রাঙানির মধ্যে সকালে টসে জিতে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় পাকিস্তান। ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই খাতা খোলার আগে মাহমুদুল হাসান জয় স্লিপে ক্যাচ দিয়ে ফিরলে শুরুতেই ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। এরপর অভিষিক্ত তানজিদ হাসান তামিম (২৬) ও মুমিনুল হক (২২) ইতিবাচক শুরুর ইঙ্গিত দিলেও ইনিংস বড় করতে পারেননি। দ্বিতীয় সেশনে পাকিস্তানি বোলারদের দাপট আরও বাড়ে। ৩৯তম ওভারে ১১৬ রানে ষষ্ঠ উইকেট (মেহেদী হাসান মিরাজ) পড়তেই যেন খাদের কিনারায় চলে যায় বাংলাদেশ। নাজমুল হোসেন শান্ত (২৯), মুশফিকুর রহিম (২৩) এবং মেহেদী হাসান মিরাজ (০) সবাই থিতু হয়েও দ্রুত ফিরে যান।

যখন ৪ উইকেটে ১০৬ রানে লিটন উইকেটে আসেন, তখনো পরিস্থিতি ছিল থমথমে। অষ্টম ব্যাটসম্যান হিসেবে তাইজুল ইসলাম যখন যোগ দিলেন, লিটনের রান তখন মাত্র ২। আকাশ মেঘলা, পাকিস্তানের বোলারদের বল মুভ করছে, আর একমাত্র স্পিনার সাজিদ খান ক্রমাগত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছেন তার আক্রমণাত্মক মেজাজি বোলিংয়ে এই কঠিন কন্ডিশনে লিটন অন্য প্রান্তে প্রায় ওয়ানডে মেজাজে ব্যাটিং শুরু করেন।

লিটনের এই ইনিংসটি শুধু রানের জন্য নয়, বরং যেভাবে তিনি লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যানদের আগলে রেখেছেন, তার জন্য বিশেষ হয়ে থাকবে। তিনি ওভারের বেশির ভাগ বল নিজে খেলতেন। ওভারের শুরুতে সিঙ্গেল নেওয়ার সুযোগ থাকলেও ফিরিয়ে দিতেন, আর পঞ্চম বা ষষ্ঠ বলে সিঙ্গেল নিয়ে স্ট্রাইক নিজের কাছে রাখতেন যাতে পরের ওভারে নিজেই স্পিন বা পেসের মুখোমুখি হতে পারেন। সাজিদ খানকে সুইপ করে দুই ফিল্ডারের মাঝ দিয়ে চার মেরে নার্ভাস নাইন্টিজে পৌঁছানো কিংবা খুররম শেহজাদকে ‘হুক’ করে ছক্কা মারা লিটনের এমন রাজকীয় ব্যাটিং পাকিস্তানকে মানসিকভাবে ব্যাকফুটে ঠেলে দেয়।

এই মহাকাব্যিক ইনিংসের মাঝে লিটন অবশ্য ভাগ্যকেও পাশে পেয়েছেন। ব্যক্তিগত ৫২ রানের মাথায় খুররম শেহজাদের একটি বাউন্সার তার গ্লাভস ছুঁয়ে মোহাম্মদ রিজওয়ানের গ্লাভসে জমা পড়েছিল। পাকিস্তান জোরালো আবেদন করলেও ততক্ষণে দুটি রিভিউ হারিয়ে ফেলায় তারা আর রিভিউ নেওয়ার সাহস দেখায়নি। এ বিষয়ে শেহজাদ দিন শেষে বলেছেন, ‘কখনো কখনো এমন হয়। তারা ১১৬ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল। লিটনের ভাগ্য সহায় হয়েছে। একটা নয়, দুটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল। যদি সেগুলো নেওয়া যেত... এ রকম অনেক যদি-কিন্তু আছে। যদি তেমন হতো, তাহলে হয়তো সবকিছুই আলাদা হতো। হয়তো তারা দুইশ’র আগেই অলআউট হয়ে যেত।’

কিন্তু সাহসীদের এ রকম দু-একটা ব্যত্যয় থাকলেও প্রকৃতিই তাদের বাঁচিয়ে দেয়। লিটনকে যোগ্য সঙ্গ দিয়েছেন তাইজুল ইসলাম, তাসকিন আহমেদ ও শরীফুল ইসলাম। সপ্তম উইকেটে তাইজুলের (১৬) সঙ্গে ৬০ রান, তাসকিনের সঙ্গে ৩৮ রান এবং নবম উইকেটে শরীফুলের সঙ্গে মূল্যবান ৬৪ রান যোগ করেন লিটন। ৯৯ রানে থাকা অবস্থায় শরীফুল এলবিডব্লিউ আউট হলে লিটন মুহূর্তেই রিভিউর আবেদন করেন এবং রিভিউতে দেখা যায় শরীফুল নটআউট ছিলেন।

তারপর শেহজাদের বলে কভার দিয়ে চোখ জুড়ানো শটে ১৩তম বাউন্ডারি তুলে নিয়ে ১৩৫ বলে পূর্ণ করলেন সেঞ্চুরি। টেস্ট ক্রিকেটে এটি লিটনের ষষ্ঠ সেঞ্চুরি, যার তিনটিই পাকিস্তানের বিপক্ষে। ২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে এই পাকিস্তানের বিপক্ষেই ২৬ রানে ৬ উইকেট হারানোর পর ১৩৮ রানের এক অবিশ্বাস্য ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। তবে সেদিন তার পাশে ৭৮ রান করে দাঁড়িয়েছিলেন মিরাজ। কিন্তু গতকাল সিলেটের পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন; তাইজুলের ১৬ রানই ছিল লিটন বাদে দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান। ফলে এই সেঞ্চুরিটি লিটনের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা হিসেবে গণ্য হবে। শেষ পর্যন্ত হাসান আলীকে পুল করতে গিয়ে ডিপ স্কয়ার লেগের ফিল্ডারের হাতে ক্যাচ দিয়ে নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হন তিনি।

লিটনের এই দুর্দান্ত সেঞ্চুরির কারণে পাকিস্তানের খুররম শেহজাদের ৪ উইকেট এবং মোহাম্মদ আব্বাসের ৩ উইকেটের দুর্দান্ত বোলিং পারফরম্যান্সও ঢাকা পড়ে গেছে।

বাংলাদেশ অলআউট হওয়ার পর দিনের শেষভাগে প্রথম ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমেছে পাকিস্তান। প্রথম দিনের খেলা শেষ হওয়া পর্যন্ত পাকিস্তান কোনো উইকেট না হারিয়ে ২১ রান সংগ্রহ করেছে। দুই ওপেনার আজান আওয়াইস এবং আবদুল্লাহ ফজল উইকেটে সাবলীলভাবে টিকে আছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত