বাংলাদেশ ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় ধরে চলা 'পঞ্চপাণ্ডব' বা বিশেষ কোনো ক্রিকেটারকে 'সুপারস্টার' হিসেবে মহিমান্বিত করার সংস্কৃতির নেতিবাচক দিক নিয়ে এবার খোলামেলা কথা বলেছেন বর্তমান টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন দাস। দেশের ক্রিকেটে সিনিয়রদের অবদানকে খাটো না করেও লিটন স্পষ্ট জানিয়েছেন, এ ধরনের বিশেষ তকমা ড্রেসিংরুমের আবহে তরুণ ও জুনিয়র ক্রিকেটারদের ওপর এক ধরণের অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করত।
সম্প্রতি বিসিবির অফিশিয়াল পডকাস্ট ‘চার-ছক্কা’-এ অংশ নিয়ে লিটন দাস জানান, অতীতে তারকা ক্রিকেটারদের অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার কারণে জুনিয়রদের জন্য ড্রেসিংরুমের পরিবেশ কতটা আড়ষ্ট ছিল। লিটনের আগে সৌম্য সরকার এবং খোদ সাকিব আল হাসানও এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছিলেন যে, বড় তারকাদের ওপর অতিরিক্ত আলোকপাত বাকি ক্রিকেটারদের বিকাশে এক প্রকার অবিচার তৈরি করেছিল।
নিজের ক্যারিয়ারের শুরুর দিককার অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে লিটন বলেন, "আমি যখন প্রথম জাতীয় দলে আসি, তখন সিনিয়র ক্রিকেটাররা অনেক বছর ধরে খেলছিলেন। এমন এক পরিস্থিতি ছিল যে, চাইলেই তাদের সাথে প্রাণখুলে মজা করা যেত না। বয়সের ও অভিজ্ঞতার বিশাল ব্যবধানের কারণে আমি নিজেও বেশ গুটিয়ে থাকতাম, বেশি কথা বলতাম না। সিনিয়ররা যথেষ্ট অমায়িক ও রসিক ছিলেন, কিন্তু জুনিয়র হিসেবে আমরা সেই স্বাচ্ছন্দ্যটা পেতাম না।"
তবে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে বর্তমান ক্রিকেট দলের ড্রেসিংরুমের পরিবেশ পুরোপুরি বদলে গেছে বলে দাবি করেন এই ওপেনার। বর্তমান দলের নেতৃত্বের অন্যতম এই কাণ্ডারি জানান, "এখন আমাদের ড্রেসিংরুমে শুধুই ক্রিকেটীয় আনন্দ আর সুস্থ বিনোদন চলে। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে আমাদের স্কোয়াডের প্রায় আটজন ক্রিকেটারই অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী দলের। তারা প্রত্যেকে একে অপরের বন্ধু। আর তাসকিন, মুস্তাফিজরা আমার কাছাকাছি ব্যাচের হওয়ায় আমাদের মাঝে বয়সের কোনো বড় তফাৎ নেই। আমরা খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখি। মাঠে ভালো পারফর্ম করতে হলে খেলাটা উপভোগ করা জরুরি, আর সে জন্য ড্রেসিংরুমের পরিবেশ যতটা সম্ভব চাপমুক্ত ও উন্মুক্ত রাখার চেষ্টা করি আমরা।"
ড্রেসিংরুমের এই চমৎকার ও সমতাপূর্ণ পরিবেশ ধরে রাখতেই দলে কোনো একক খেলোয়াড়কে 'সুপারস্টার' বা বিশেষ কেউ হিসেবে আলাদা করার ঘোর বিরোধী লিটন। নিজেকে বড় তারকা হিসেবে ভাবার মানসিকতা ক্রিকেটারদের ওয়ার্ক ইথিক বা কাজের ধরনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি মনে করেন। সমসাময়িক ক্রিকেটে টিকে থাকতে হলে প্রতিদিন নিজেকে নতুন করে গড়ার বিকল্প নেই। দলগত ঐক্যের গুরুত্ব বোঝাতে লিটন বলেন, স্কোয়াডের ১৫ জন খেলোয়াড়ই যেন নিজেকে সমান ভাবেন এবং একই নিয়ম ও লক্ষ্য নিয়ে একসাথে কাজ করতে পারেন।
পেস ইউনিটের দুই প্রধান অস্ত্র তাসকিন আহমেদ ও মুস্তাফিজুর রহমানের উদাহরণ টেনে লিটন যোগ করেন, "মোস্তাফিজ ও তাসকিন বাংলাদেশ পেস বোলিংয়ের অনেক বড় নাম। অভিজ্ঞতার বিচারে নতুনদের চেয়ে তারা অনেক এগিয়ে। কিন্তু মুস্তাফিজের দলে যত বড় ইমপ্যাক্টই থাকুক না কেন, সে যদি নিজেকে সুপারস্টার ভেবে আলাদা মনে করে বা দল যদি তাকে ভিন্ন চোখে দেখে, তবে নিয়মের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। দলের জন্য মুস্তাফিজ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, একদম নতুন আসা বা এখনও অভিষেক না হওয়া একজন খেলোয়াড়ও ঠিক সমান গুরুত্বপূর্ণ। দলের প্রত্যেক সদস্যের মানসিকতা একই হওয়া উচিত যাতে সবাই মিলে এক হয়ে লড়াই করা যায়।"
লিটনের মতে, ক্রিকেটাররা কে কত ভালো বা কার সামর্থ্য কতটুকু তা মাঠের পারফরম্যান্সেই প্রমাণিত হয়। তাই আলাদা করে কাউকে 'সুপারস্টার' তকমা দিয়ে দলের ভেতর কোনো বিভাজন তৈরি না করে, সবাইকে একই সুতোয় বেঁধে এগিয়ে যাওয়াই বাংলাদেশের ক্রিকেটের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
