জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম চাবিকাঠি নারীর ক্ষমতায়ন

দেশ

আপডেট : ১৭ মে ২০২৬, ০১:৪২ পিএম

বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরসিংদু গ্রামের সুলেখা বেগম। স্বামী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তাদের সংসার। স্বামী জমির উদ্দিন নদীতে মাছ শিকার করে যা আয় করে তাই দিয়ে তাদের সংসার চলে।

একদিন জরিনা বেগম নামে একজন সমাজকর্মীর সঙ্গে পরিচয় হয় সুলেখার। তাকে সংসারের অভাবের কথা খুলে বলেন তিনি। তারপর সেই সমাজকর্মীর পরামর্শে প্রথমে স্বল্পসুদে ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তিনটি ছাগলের বাচ্চা কেনেন এবং সেগুলো লালন পালন শুরু করেন। দুই বছরের মধ্যে ছাগলগুলো বড় হয় এবং তিনটি করে মোট নয়টি বাচ্চা দেয়। বাচ্চাগুলো কিছুদিন পর বিক্রি করে সুলেখা ঋণের টাকা পরিশোধ করেন। আবারও সে একই প্রতিষ্ঠান থেকে আরও ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে গাভী কেনেন। অল্প কিছুদিন পর গাভীটি বাচ্চা দেয়। সুলেখা গাভীর দুধ বিক্রি করেন। এরমধ্যে সুলেখা তার স্বামীকে একটি রিকশা ভ্যান কিনে দেন।

বর্তমানে সুলেখা তিনটি গাভী ও ১৩টি ছাগলের মালিক। সুলেখার বাড়িতে তাকে সহযোগিতা করার জন্য তিনজন সহকারি রাখা হয়েছে। গাভী থেকে প্রতিদিন দুধ দিয়ে দই-মিষ্টি তৈরি করে সেগুলো সুলেখার স্বামী বাজারে পৌঁছে দেয়। এরপর জমির উদ্দিন নিজের কাজে চলে যায়। স্বামীর পাশাপাশি সুলেখার উপার্জনের ফলে তাদের সংসারে আর অভাব নেই। তাদের সন্তানেরা এখন স্কুলে যায়।

সুলেখা একজন নারী উদ্যোক্তা। উদ্যোক্তা হলেন এমন একজন উদ্ভাবনী ও দূরদর্শী ব্যক্তি, যিনি নতুন ব্যবসার আইডিয়া বা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ঝুঁকি নিয়ে, নিজস্ব অর্থ ও শ্রম বিনিয়োগ করে একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তিনি বাজার বিশ্লেষণ করে নতুন পণ্য বা সেবার সুযোগ তৈরি এবং সফলতার জন্য কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্ব দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেন।

একজন নারী উদ্যোক্তা আর একজন পুরুষ উদ্যোক্তার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন হলো নারীদের নিজস্ব আয়, সম্পদ ও সময়ের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ বাড়ানো।

এটি দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পারিবারিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্প, ক্ষুদ্রঋণ, ই-কমার্স ও ফ্রিল্যান্সিংয়ে নারীর অংশ নেওয়ার বৃদ্ধি এবং ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সক্ষমতা জোরদার করা হচ্ছে।

নারীর ক্ষমতায়ন হলো শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে নারীর নিজস্ব মূল্যবোধ ও মর্যাদা বৃদ্ধি করা, যা টেকসই জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম মূল চাবিকাঠি। এটি লিঙ্গ বৈষম্য দূর করে, উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, দারিদ্র্য হ্রাস করে এবং সমাজে সুস্থ পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ তৈরিতে অপরিহার্য ভূমিকা রাখে।

আমাদের সমাজে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, নিরাপত্তা ও সামাজিক বাধার কারণে নারীর ক্ষমতায়নে অভাবনীয় সাফল্য থাকলেও, এটি এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় মোকাবিলা করতে হবে। নারীদের ক্ষমতায়িত করতে হবে। তাদের স্বাবলম্বী করতে হবে।

নারী উদ্যোক্তার মাধ্যমে নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া, সম্পদ ও আয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে, পারিবারিক ও সামাজিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সমঅধিকার এবং নিজের জীবন ও সময়ের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, সে জন্য আমাদের কাজ করে যেতে হবে। আর এই বিষয়গুলো বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হচ্ছে। আর এসব নারীর ক্ষমতায়নে অনেক বেশি অবদান রাখছে। সুলেখাদের মতো আরও অনেককে উদ্যোক্তা হয়ে নিজেকে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে। তবেই আমাদের দেশ একদিন স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে উঠবে।

সূত্র: বাসস

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত