রিবক, গিতক, দমি, জাক্সান এগুলো হলো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী গারো সম্প্রদায়ের একেকটি ঐতিহ্যবাহী অলংকার। আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়ায় আদিবাসীদের প্রাচীন এই অলংকার এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তবে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতিচর্চা ও ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য নেত্রকোনায় প্রতিষ্ঠিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমির জাদুঘরে এখনো সংরক্ষিত রয়েছে বিভিন্ন জাতিসত্তার নানা স্মৃতি।
মেঘালয়ের গারো পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা সোমেশ্বরী নদীর তীরের শহর নেত্রকোনার দুর্গাপুর। এই জনপদ যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অনন্য, তেমনই সমৃদ্ধ এখানকার হাজার বছরের নৃগোষ্ঠীগত সংস্কৃতিতে। আর এই সীমান্ত অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি।
১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই একাডেমিটি কেবল একটি সরকারি ভবন নয়; এটি মূলত এই অঞ্চলের গারো, হাজং, কোচ, ডালু ও বানাইদের মতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রাণের স্পন্দন। বহু বছর ধরে নিজস্ব ভাষা, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, সুর আর নৃত্যের যে সুতা ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তাকে পরম যত্নে জোড়া লাগানোর কাজ করে যাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠান।
বরাং ঘর গারো সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী এক ধরনের মাচাং ঘর বা পাহাড়ি কুঁড়েঘর। সাধারণত জুম চাষের ফসল ও ক্ষেতকে বন্যহাতি ও পাখির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ক্ষেতের চারপাশে বা গাছের ওপর এই ঘরগুলো তৈরি করার প্রচলন ছিল। তবে এই সংস্কৃতি এখন প্রায় বিলুপ্ত। ছোট পরিসরে হলেও বরাং ঘরের ঐতিহ্য এখনো ধরে রেখেছে বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কালচারাল একাডেমি। এ ছাডাও আরও অসংখ্য কাঠের এবং বাঁশের তৈরি সরঞ্জাম রয়েছে একাডেমির জাদুঘরে। কালচারাল একাডেমির দ্বিতীয় তলায় গড়ে তোলা এই সংগ্রহশালায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পোশাক, অলংকার, ঐতিহ্যবাহী নানা আলোকচিত্র, আদিবাসীদের ব্যবহৃত প্রাচীন হাতিয়ার এবং বিভিন্ন পশুর প্রতিকৃতির পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্য।
এখানকার জাদুঘরে ঢুকলে এক নিমেষেই চেনা যায় এই অঞ্চলের আদিবাসীদের জীবনযাত্রাকে। সেখানে থরে থরে সাজানো রয়েছে গারোদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘দকমান্দা’, হাজংদের ‘পাথিন’, প্রাচীন শিকারের অস্ত্র, মাটির তৈজসপত্র এবং বাঁশ-বেতের তৈরি নান্দনিক গৃহস্থালি সামগ্রী। হারিয়ে যাওয়া সব ঐতিহ্যকে এখানে নথিবদ্ধ করে রাখা হয়েছে অত্যন্ত যতেœর সঙ্গে।
বাংলাদেশ হাজং সংগঠনের সভাপতি পল্টন হাজং বলেন, ‘বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি এই অঞ্চলের বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বা আদিবাসীদের সংস্কৃতিচর্চা এবং হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য তুলে ধরার একমাত্র মূল মঞ্চ। এই অঞ্চলের গারো এবং হাজংদের নানা উৎসব এই কালচারাল একাডেমি আয়োজন করে থাকে। পাশাপাশি নিজস্ব ভাষা এবং সংস্কৃতি বিকাশে একাডেমি নানাভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে এখানকার একাডেমিতে এখনো টিকে আছে পুরনো সভ্যতার নানা নিদর্শন।’
বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমির পরিচালক পরাক রিচিল বলেন, ‘একাডেমির জাদুঘরে শত বছরের পুরনো নানা নিদর্শন এখনো রয়েছে। কয়েক শত বছরের পোশাক, অলংকারসহ নানা ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন টিকে আছে জাদুঘরের সংগ্রহশালায়। আমরা এগুলো সংরক্ষণ করেছি এবং প্রদর্শনীর মাধ্যমে তুলে ধরছি। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা আসেন এবং এখানকার সংগ্রহশালা ঘুরে দেখে অনেক কিছু জানতে পারেন।’
