বড় ঈদ আর জন্মদিন দুই খুশিতে দিন রঙিন

আপডেট : ২৩ মে ২০২৬, ০৭:৪১ এএম

তমার বাবা তমাকে বলেছিল ঈদে ওর কী কী চাই তালিকা দিতে। দুদিন ভেবে তমা আজ তালিকা দিল। তালিকায় লেখা

শাওন আন্টি

রায়হান ভাইয়া

জিরন কাকা

জরিনা খালা

রোজীর মা

মনির চাচা

আলেয়া ফুফি

কাউসার মামা

খালামণি

তালিকা পড়ে ছানাবড়া চোখ বাবার। কিছুই বুঝে উঠতে না পেরে মেয়েকে বললেন, ‘ও মা! আমি তো ভেবেছি তুমি লিখবে জামা, জুতো, চশমা আর সাজুগুজুর জিনিসের কথা। তা না তুমি লিখেছ প্রতিবেশী আর আত্মীয়ের নাম। ব্যাপার কী খুলে বলো দেখি?’

তমা বলল, ‘শাওন আন্টিরা আমাদের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী। রায়হান ভাইয়ারাও তাই। জিরন কাকারা সব সময় আমাদের বাড়িতে আসা-যাওয়া করেন। আমাদের ভালো-মন্দ খোঁজখবর রাখেন। জরিনা খালার ছেলে-মেয়ে কেউ নেই। প্রতিবেশী আমাকেই নিজের মেয়ের মতো আদর করেন। রোজির আম্মু, মানে শিরিন খালা; এই গরিব-দুঃখী মানুষটি এখন আমাদের পাড়ায় না থাকলেও অনেক দিন ছিল তো! আমাদের বাড়িতেও আসত, আম্মুকে কাজেকর্মে সহযোগিতা করত। মনির চাচা, আলেয়া ফুফি, কাউসার মামা আর খালামণি আমাদের সেই আত্মীয় যারা সবচেয়ে কাছে থাকেন। সব মিলিয়ে আমি শুধু পাঁচজন প্রতিবেশী আর চারজন আত্মীয়ের নাম লিখেছি। এই তালিকা আরও বড় হবে, বাবা।’

‘তা তো বুঝলাম, মা। কিন্তু এদের নামে তালিকা কেন? ঈদে কোনো উপহার চাই

না তোমার?’

‘হ্যাঁ চাই।’

‘তাহলে কী কী চাও সেই তালিকা দাও।’

‘আমি চাই তালিকায় যাদের নাম লিখেছি সবার বাড়িতে কোরবানির গোশত পাঠাবে। আর এটাই হবে আমাকে দেওয়া ঈদের সবচেয়ে সুন্দর উপহার।’

তমার কথা শুনে বাবা মনে মনে নিজের শৈশবে হারিয়ে গেলেন। ছোটবেলায় বড় ঈদে তাদের বাড়িতে যে গরুটি আনা হতো, গরুর গলায় আয়না লাগানো ঝলমলে মালা আর মাথার মুকুট থাকত। গরুর এই সাজসজ্জা তার ঈদুল আজহার আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তুলত। অপেক্ষা করতেন কখন গরু কোরবানি দেওয়া হবে আর মালা ও মুকুটটি নিজের করে নেবেন। শুধু কি তাই! কোরবানির পর গরুর চিনাই ছাড়িয়ে তা দিয়ে ছোট ছোট খ- কেটে বাঁশের কঞ্চির সাহায্যে ঢোল বানাতেন। তার আগে চিনাই টানটান করে বেঁধে রোদে শুকিয়ে নিতেন। সেই ঢোল দিয়ে বন্ধুরা মিলে খুব আনন্দ করতেন। আরও মনে পড়ছে কোরবানির গোশতের ছোট ছোট পুঁটলা বাবা হাতে ধরিয়ে দিয়ে প্রতিবেশী ওমুকের বাড়িতে, তমুকের বাড়িতে দিয়ে আসতে বলতেন। একটু দূরে আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে কোরবানির গোশত দিতে যেতেন সাইকেলে করে। ছোটবেলার ওইসব কথা মনে পড়তে মিটিমিটি হাসেন। তমাকে বললেন, ‘কোরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করে এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর জন্য এবং এক ভাগ গরিব-দুঃখীদের মধ্যে দেওয়া ভালো এ কথা তুমি জানলে কেমন করে, মা?’

তমা বলল, ‘কেন! কাজী নজরুল ইসলামের কাছে! তিনি তার কবিতায় বলেছেন- কোরবানি হলো নিজের ভেতরের সব পাশবিক প্রবৃত্তি, লোভ ও ভীরুতাকে বিসর্জন দেওয়ার নাম। মনে নেই একদিন তুমিই আমায় কাজী নজরুল ইসলামের ‘কোরবানি’ কবিতা পড়ে শুনিয়ে এসব কথা বলেছিলে! আমরা যদি আমাদের প্রতিবেশী, গরিব-দুঃখীদের আর আত্মীয়স্বজনদের কোরবানির গোশত না দিয়ে খাই তাহলে নিজের ভেতরের লোভ আর ভীরুতাকে বিসর্জন দিলাম কোথায়?’

মেয়ের দিকে অপলক তাকিয়ে আছেন তমার বাবা। মেয়েটা দেখতে দেখতে বড় হয়ে যাচ্ছে! কী ভালো ভাবতে শিখছে! কত সুন্দর কথাগুলো মনে রেখেছে, আবার তার ব্যাখ্যাও দিল কত চমৎকারভাবে! মেয়েকে বললেন, ‘ঠিক আছে মা, তালিকায় তুমি যাদের নাম লিখেছ, যাদের নাম লেখনি সব্বাইকে কোরবানির গোশত পাঠাব। এবার আরেকটা তালিকা দাও, যেটাতে তোমার নিজের জন্য ঈদ উপহার কিছু চেয়ে সেগুলোর নাম লেখা থাকবে।’

তমা বলল, ‘তালিকা লাগবে না, তাহলে তুমি আমাকে মাথা ভরবে এমন ঝাঁকড়া চুল, গোঁফ আর গাঢ় রঙের শেরওয়ানি এনে দাও।’

‘এমা! ওসব দিয়ে তুমি কী করবে?’

‘ভুলে গেছো ঈদের পরদিন আমরা কাজিনরা যেমন খুশি তেমন সাজ খেলা খেলব! সেদিন তুবা, রাইয়ান, সেঁজুতি, ইফা, পল্লব, রাফি ওরা কে কী সাজবে জানি না। আমার মাথাভরা ঝাঁকড়া চুলের মাঝ বরাবর সিঁথি দিয়ে, গোঁফ লাগিয়ে, গাঢ় রঙের শেরওয়ানি পরে আমি সাজব কাজী নজরুল ইসলাম।’

‘কেন! তুমি কাজী নজরুল ইসলামই সাজবে কেন?’

‘এমা! তুমি ভুলে গেছ, ঈদের মাত্র তিন দিন আগে ১১ জ্যৈষ্ঠ কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন! যেমন খুশি তেমন সাজে কাজী নজরুল ইসলাম সেজে প্রিয় এই কবিকে সম্মান জানাতে চাই। মনে মনে ঠিক করেছি সেদিন দাদা, দাদুসহ বাড়ির সব্বাইকে কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘খুকী ও কাঠবিড়ালি’ ছড়াটি আবৃত্তি করে শোনাব।’

বলতে বলতে তমা আবৃত্তি করছে

কাঠবিড়ালি! কাঠবিড়ালি! পেয়ারা তুমি খাও?

গুড়-মুড়ি খাও? দুধ-ভাত খাও? বাতাবি-নেবু? লাউ?

বিড়াল-বাচ্চা? কুকুর-ছানা? তাও

ডাইনি তুমি হোঁৎকা পেটুক,

খাও একা পাও যেথায় যেটুক!

বাতাবি-নেবু সকলগুলো

একলা খেলে ডুবিয়ে নুলো।

বাবা বিস্ময়ভরা চোখে ছোট কাজী নজরুল ইসলামের মুখে তাকিয়ে আবৃত্তি শুনছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত