দুশ্চিন্তা ও ঋণমুক্তির বিশেষ দোয়া

আপডেট : ২৫ মে ২০২৬, ০১:১৬ এএম

মানুষের জীবনে সুখ-দুখ, স্বচ্ছলতা-অভাব, শান্তি-দুশ্চিন্তা সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। কখনো মানুষ এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়, যখন ঋণের বোঝা তার জীবনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। ঋণ শুধু অর্থনৈতিক সংকটই সৃষ্টি করে না, এটি মানুষের মনকে অস্থির করে, ইবাদতে অমনোযোগী করে এবং জীবনের স্বাভাবিক প্রশান্তি নষ্ট করে দেয়। ইসলাম মানুষের এই দুর্বলতা ও কষ্টকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছে। তাই মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতের জন্য দুশ্চিন্তা ও ঋণমুক্তির বিশেষ দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন।

আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা এ বিষয়ে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে প্রবেশ করে দেখলেন, আবু উমামা (রা.) নামাজের সময় ছাড়া অন্য সময় মসজিদে বসে আছেন। নবীজি (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু উমামা! কী ব্যাপার, তোমাকে নামাজের সময় ছাড়া মসজিদে বসে থাকতে দেখছি কেন? তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! দুশ্চিন্তা ও ঋণ আমাকে গ্রাস করেছে।

এ কথা শুনে রাসুল (সা.) অত্যন্ত মমতা ও দয়ার সঙ্গে বললেন, আমি কি তোমাকে এমন কিছু শব্দ শিখিয়ে দেব না, যা তুমি পড়লে আল্লাহ তোমার দুশ্চিন্তা দূর করবেন এবং তোমার ঋণ আদায় করে দেবেন? এরপর তিনি এই দোয়া শিক্ষা দিলেন, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হুজনি, ওয়া আউজুবিকা মিনাল আজযি ওয়াল কাসালি, ওয়া আউজুবিকা মিনাল জুবনি ওয়াল বুখলি, ওয়া আউজুবিকা মিন গলাবাতিদ দাইনি ওয়া কহরির রিজাল।’ অর্থাৎ হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে। আমি আশ্রয় চাই অক্ষমতা ও অলসতা থেকে। আমি আশ্রয় চাই কাপুরুষতা ও কৃপণতা থেকে। আর আশ্রয় চাই ঋণের বোঝা ও মানুষের অত্যাচার থেকে।

রাসুল (সা.) নির্দেশ দিলেন, সকাল ও সন্ধ্যায় এই দোয়া পাঠ করতে। আবু উমামা (রা.) বলেন, আমি তাই করলাম। ফলে আল্লাহ আমার দুশ্চিন্তা দূর করে দিলেন এবং আমার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করে দিলেন। (আবু দাউদ)

ঋণ মানুষের আত্মমর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একজন ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি সবসময় মানসিক চাপে থাকে। ফলে তার ইবাদতে একাগ্রতা কমে যায়, পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হয় এবং জীবনের আনন্দ মøান হয়ে পড়ে। তাই ইসলাম অপ্রয়োজনীয় ঋণ গ্রহণকে নিরুৎসাহিত করেছে। তবে প্রয়োজনের কারণে ঋণ নেওয়া বৈধ। কিন্তু ঋণ নেওয়ার সময় তা পরিশোধের দৃঢ় নিয়ত থাকতে হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ গ্রহণ করে তা পরিশোধের নিয়তে, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা আদায় করে দেন। আর যে ব্যক্তি ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে নেয়, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন।’ এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, সততা ও সৎ নিয়ত ঋণমুক্তির অন্যতম মাধ্যম।

এই দোয়াটির প্রতিটি বাক্যে গভীর তাৎপর্য রয়েছে। এখানে দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। কারণ অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা মানুষের মনোবল নষ্ট করে দেয়। এরপর অক্ষমতা ও অলসতা থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। কারণ অনেক সময় অলসতা মানুষের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণ হয়। পরিশ্রম ও চেষ্টা ছাড়া সফলতা আসে না। আবার কাপুরুষতা ও কৃপণতা থেকেও আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। কাপুরুষ ব্যক্তি সত্য কথা বলতে পারে না, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে না। আর কৃপণতা মানুষের অন্তর সংকীর্ণ করে দেয়। সবশেষে ঋণের বোঝা ও মানুষের অত্যাচার থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, ঋণ মানুষের স্বাধীনতা ও মানসিক শান্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই একজন মুমিনের উচিত সবসময় আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া এবং হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জনের চেষ্টা করা।

ঋণমুক্তির জন্য শুধু দোয়া করলেই হবে না, তার সঙ্গে প্রয়োজন সৎ প্রচেষ্টা, পরিশ্রম ও আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল। দোয়া হলো মুমিনের শক্তিশালী অস্ত্র। যখন মানুষ আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহকে ডাকে, তখন আল্লাহ তার জন্য অপ্রত্যাশিত পথ খুলে দেন।

লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষা সচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত