নতুন মিররলেস ক্যামেরা কিনে আর তর সইছিল না। যেদিন ক্যামেরা কিনলাম তার পরদিন রাতেই বার্ডিংবিডি ট্যুরস-এর সঙ্গে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে গেলাম। ভালো একটা অনুশীলন হয়ে যাবে এবার, সঙ্গে নতুন নতুন ঝকঝকে ছবি; ভাবতেই ভালো লাগছিল। পরদিন সকালে সুনামগঞ্জ পৌঁছে টেম্পুযোগে তাহিরপুর গিয়ে ‘জলসঙ্গী’ নামের বজরায় উঠলাম। দুইদিনের জন্য জলসঙ্গীই আমাদের থাকা-খাওয়ার ভাসমান হোটেল। পথে বেগুন ও ডিমভাজা দিয়ে ভুনাখিচুড়ি দিয়ে নাশতা সারলাম। আমি তো বজরার ছাদে বসে মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে খেলাম। মাঝে মাঝে আকাশে উড়ন্ত হাঁসের ঝাঁক অথবা পানিতে ভাসমান পানকৌড়ি ও গাঙকৈতরের ছবি তুলছি। বেলা সাড়ে এগারোটায় বজরা গোলাবাড়ি টাওয়ারের কাছে নোঙর করল। বজরা থেকে কোষা নৌকায় উঠে হাওরের দিকে রওয়ানা হলাম।
গোলাবাড়ি থেকে সরু একটি খাল পেরিয়ে কোষা নৌকা রৌয়ার বিলে পড়ল। পথে বড় ও মাঝরি সাদা বক ও অগুনতি শামুকখোলের দেখা পেলাম। ওদের ছবি তুলে একটু এগুতেই হাঁসের এক বিশাল ঝাঁকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। নৌকা যতই সামনে আগায় হাঁসেরা ততই ভাসতে ভাসতে দূরে চলে যায়। কোনোভাবেই ওদের কাছে পাচ্ছি না। লালমুড়ি, রাঙা দিঘেরি, বামুনিয়া, নাইরলি, পান্তামুখী, পিয়ং, লালশীর, নীলশীর, সোনা দিঘেরি ও লেনজা হাঁস এবং ধূসর রাজহাঁসের মেলায় মাথায় লালটুপি পরা প্রচুর মৌলবি সাহেবদের বিলময় ঘুরে বেড়াতে দেখলাম। অন্য হাঁসগুলো বেশ দূর থেকে উড়লেও মৌলবি সাহেবরা উড়ে সবচেয়ে শেষে। কাজেই অন্যদের তুলনায় এদেরই কিছুটা কাছে পাওয়া যায়। দুপুর ১২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত হাওরের রৌয়া, চটাইন্না, লেইছমারা ও রুপাভূঁই বিল ঘুরে প্রচুর মৌলবি হাঁসের ছবি তুললাম। হাওরে অন্যান্য হাঁসের তুলনায় ওদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালের ঘটনা এটি। ওদের প্রথম দেখি ২০১৬ সালে ২২ জানুয়ারি এই রৌয়া বিলেই। এ ছাড়াও বিভিন্ন সময় দেখেছি চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরইল বিল ও রাজশাহীর পদ্মায়।
লালটুপি পরা এই হাঁসগুলো এদেশের সচরাচর দৃশ্যমান পরিযায়ী পাখি মৌলবি হাঁস। অন্তত সিলেট অঞ্চলে ওরা এ নামেই পরিচিত। স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে মাথার ঝুঁটিটি দেখলে মনে হবে যেন মাথায় টুপি পরে আছে, তাই এই নাম। তবে এদের কেতাবি নাম রাঙ্গামুড়ি হাঁস। বজ্রমুড়ি বা রাঙ্গাঝুঁটি হাঁস নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম জবফ-পৎবংঃবফ চড়পযধৎফ। গোত্র অ্যানাটিডি, বৈজ্ঞানিক নাম ঘবঃঃধ ৎঁভরহধ (নেট্টা রুফিনা)। মূল আবাস দক্ষিণ ইউরোপ, তুরস্ক, মধ্য এশিয়া, চীন ও মঙ্গোলিয়ায়। শীতে বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশ ও আফ্রিকায় পরিযায়ন করে।
রাঙ্গামুড়ি হাঁস বাংলাদেশের সুন্দর হাঁসগুলোর একটি। প্রাপ্তবয়স্ক হাঁস লম্বায় ৫০-৬৫ সেন্টিমিটার ও ওজনে ৮৩০-১ হাজার ৪০০ গ্রাম। হাঁসা ও হাঁসি ভিন্ন রকম। হাঁসা আকারে বড়, তার মাথাও বড়। প্রজননকালে মাথার টুপি লালচে-কমলা বর্ণ ধারণ করে। গলার ওপরটা হয় গাঢ় খয়েরি। ঘাড়, গলার নিচ, বুক, পেট-তলপেট ও কোমর কালো। পিঠ ধূসর-বাদামি। দেহের দু-পাশ সাদা, ডানার নিচও সাদা। লেজ কালো ও লেজের আগা ধূসর। চঞ্চু গোলাপি-লাল। প্রজননহীন হাঁসার টুপির কমলা-লাল পালক ঝড়ে পড়ে ও হাঁসির মতো খয়েরি রঙ বেরিয়ে আসে। হাঁসির মাথার টুপি খয়েরি। পুরো দেহ হালকা ধূসর-বাদামি। গাল, গলা ও লেজের তলা সাদা। হাঁসির চঞ্চু বাদামি ও অগ্রভাগ হালকা হলুদ। হাঁসার চোখ লাল, কিন্তু হাঁসিরটা কালো। হাঁসার পা ও পায়ের পাতা কমলা-হলুদ, কিন্তু হাঁসির ক্ষেত্রে তা কালচে। অপ্রাপ্তবয়স্ক হাঁসের দেহের পালকের রঙ গাঢ়, পেট বহুরঙা ও চঞ্চু কালচে।
পরিযায়ী মৌলবি হাঁসদের শীতে সিলেট, ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জলাধার, হাওর, বিল, নদীতে দেখা যায়। সচরাচর একক বা মিশ্র দলে বিচরণ করে। একেক দলে শ-খানেক থেকে কয়েক হাজার পর্যন্ত পাখি থাকতে পারে, বিশেষ করে টাঙ্গুয়ার হাওরের ঝাঁকগুলোতে হাজার হাজার হাঁস থাকে। ওরা দিনে ও সন্ধ্যায় বেশি সক্রিয় থাকে। পানিতে সাঁতার কেটে বা অল্প পানিতে গলা ডুবিয়ে জলজ আগাছা, উদ্ভিদের সবুজ অংশ, বীচি ও মূল, শৈবাল, পোকামাকড়, শামুক, ব্যাঙ, ছোট মাছ ইত্যাদি খুঁজে খায়। বেশ দ্রুত উড়তে পারে। ভয় পেলে পানি থেকে খাড়া উড়ে উঠে যায়। হাঁসা ‘আওয়েহ গিক, পারর-পারর-পারর...’ ও হাঁসি ‘ব্রাহ-ব্রাহ-ব্রাহ...’ শব্দে ডাকে।
এপ্রিল থেকে জুলাই প্রজননকাল। এ সময় ওদের মূল আবাস এলাকার জলাশয় বা হ্রদের পাশে লতাপাতার মধ্যে নলখাগড়া ও ঘাসের স্তূপ দিয়ে বাসা তৈরি করে তাতে পালকের আস্তরণ দেয়। হাঁসি হালকা সবুজ রঙের ৮-১২টি ডিম পাড়ে, যা ২৬-২৮ দিনে ফোটে। ডিমে তা দেওয়া থেকে ছানা বড় হওয়া পর্যন্ত সব দায়িত্ব হাঁসির। ছানারা ৩৫-৪০ দিনে উড়তে শিখে ও ৪৫-৫০ দিনে স্বাবলম্বী হয়। তবে, বয়োপ্রাপ্ত হতে ১-২ বছর সময় লাগে। আয়ুষ্কাল প্রায় সাত বছর।
লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ