বিশ্বকাপের বিমান ধরার আগে ঘরের মাঠে শেষ ম্যাচটি স্মরণীয় করে রাখল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। রিও ডি জেনিরোর বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়ামে হাজার হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে পানামাকে ৬-২ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে সেলেসাওরা।
প্রথমার্ধের কিছুটা ছন্দহীনতা ও শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে দ্বিতীয়ার্ধে কার্লো আনচেলত্তির বেঞ্চের শক্তিই মূলত ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেয়। এই জয়ের পর মারাকানার গ্যালারিতে মুখরিত হয়ে ওঠে ঐতিহ্যবাহী স্লোগান— "ও চ্যাম্পিয়াও ভলতো" (চ্যাম্পিয়নরা ফিরে এসেছে), যা হেক্সা (ষষ্ঠ বিশ্বকাপ) মিশনের আগে দলের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিল।
ইভেতের সুর ও রোনালদিনিয়োর স্মৃতিতে বর্ণিল সূচনা
ম্যাচ শুরুর আগে মারাকানার ঐতিহাসিক সবুজ গালিচায় বসেছিল চাঁদের হাট। ব্রাজিলের অন্যতম জনপ্রিয় পপ তারকা ইভেত সাঙ্গালো তাঁর চেনা ছন্দে পুরো স্টেডিয়াম মাতান। এই সঙ্গীত উৎসবে তাঁর সঙ্গে মঞ্চে যোগ দেন ২০০২ বিশ্বকাপজয়ী দলের মহাতারকারা। সাবেক বিশ্বসেরা ফুটবলার রোনালদিনিও গাউচো মাঠে প্রবেশ করতেই গ্যালারি থেকে তুমুল করতালির মাধ্যমে তাঁকে বরণ করে নেওয়া হয়। তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সেসময়ের পেন্তাচ্যাম্পিয়ন (পঞ্চম বিশ্বকাপজয়ী) দলের সতীর্থ দেনিলসন, এদিনিলসন, জুনিয়র ও বেলেত্তি। ম্যাচ শুরুর আগেই গ্যালারিতে উপস্থিত ৭২ হাজার দর্শককে এক অন্যরকম নস্টালজিয়ায় ভাসিয়ে দেয় এই আয়োজন।
হুঙ্কার, দুয়োধ্বনি ও স্বস্তি
ম্যাচ শুরু হতে না হতেই গ্যালারির উন্মাদনা গোল উৎসবে রূপ নেয়। মাত্র এক মিনিটের মাথায় ক্যাসেমিরোর দারুণ এক ট্যাকল থেকে বল পেয়ে ভিনিসিউস জুনিয়র ডি-বক্সের কোণা থেকে ডান পায়ের মাপা শটে ব্রাজিলকে এগিয়ে নেন।
তবে শুরুর এই দাপট বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ডিফেন্ডার লেও পেরেইরার একটি ভুল পাসকে কেন্দ্র করে ফ্ল্যামেঙ্গোর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবের সমর্থকেরা গ্যালারি থেকে তাঁকে ধুয়ে দেন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত চাপের মাঝেই ১৩ মিনিটে ব্রুনো গিমারায়েসের ফাউল থেকে ফ্রি-কিক পায় পানামা। মাইকেল মুরিলোর নেওয়া ফ্রি-কিকটি মাথেউস কুনিহার গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করলে বোকা বনে যান গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকার। ১-১ সমতায় ফেরার পর ব্রাজিল কিছুটা খেই হারিয়ে ফেলে। এমনকি ৩১ মিনিটে আরেকটি নিশ্চিত গোল ঠেকিয়ে দিয়ে অ্যালিসন দলকে রক্ষা করেন। দলের এই মলিন পারফরম্যান্সের মাঝে গ্যালারিতে উপস্থিত সমর্থকেরা ইনজুরির কারণে মাঠের বাইরে থাকা নেইমারের নাম ধরে চিৎকার করতে থাকেন।
অবশ্য প্রথমার্ধের ঠিক শেষ মুহূর্তে (৩৯ মিনিটে) ভিনিসিউসের পাস থেকে উড়ে আসা বলে চতুর হেডে গোল করে ব্রাজিলকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে নেন ক্যাসেমিরো।
আনচেলত্তির মাস্টারস্ট্রোক: দ্বিতীয়ার্ধেই আসল চমক
পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী কোচ কার্লো আনচেলত্তি প্রথমার্ধের দলের কেবল লেও পেরেইরাকে রেখে (যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি যোগ দিতে যাওয়া মার্কিনহোস ও গ্যাব্রিয়েল মাগালাসের অনুপস্থিতির কারণে) বাকি ১০ জন খেলোয়াড়কেই বদলে ফেলেন। গোলরক্ষক ওয়েভারটন ছাড়া স্কোয়াডের বাকি সবাইকেই এদিন মাঠে নামিয়ে পরীক্ষা করেন কোচ। আর কোচের এই কৌশলেই কেল্লাফতে!
- রায়ানের চাতুর্য (৫৩ মিনিট): এনদ্রিকের তীব্র চাপে পানামার গোলরক্ষক বল ক্লিয়ার করতে ভুল করলে ১৯ বছর বয়সী ভাস্কো দা গামার সাবেক তরুণ তুর্কি রায়ান লব শটে (চিপ করে) বল ফাঁকা জালে জড়িয়ে ব্যবধান ৩-১ করেন।
- লুকাস পাকেতার নাচ (৬০ মিনিট): দানিলোর চমৎকার পাস থেকে ওয়ান-টাচ শটে মারাকানায় গোল উৎসবের চতুর্থ আনন্দের উপলক্ষ এনে দেন পাকেতা।
- ইগর থিয়াগোর স্পট কিক (৬৩ মিনিট): বক্সের ভেতর ফাউলের শিকার হওয়া থিয়াগো নিজেই পেনাল্টি থেকে 'পারাডিনহা' (শট নেওয়ার আগে হালকা থমকে যাওয়া) স্টাইলে গোল করে স্কোরলাইন ৫-১ করেন।
- দানিলোর নান্দনিকতা (৮১ মিনিট): বোটফোগোর দানিলোর পায়ে আসে ষষ্ঠ গোল। পাকেতার পাস থেকে বল পেয়ে পানামার ডিফেন্ডারকে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে তিনি চমৎকার ফিনিশিং দেখান।
ম্যাচের একদম শেষভাগে পানামার কার্লোস হার্ভি দূরপাল্লার এক রকেট গতির শটে ব্রাজিলের দ্বিতীয় গোলরক্ষক এদেরসনকে পরাস্ত করলে গোলবন্যার ম্যাচটি ৬-২ ব্যবধানে শেষ হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে যাত্রা ও চূড়ান্ত সূচি
আজ সোমবারই (১ জুন) চাটার্ড ফ্লাইটে রিও ডি জেনিরো থেকে নিউ জার্সির উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছে ব্রাজিল দল। আগামী ৬ জুন ওহাইওর ক্লিভল্যান্ডে মিশরের বিপক্ষে শেষ প্রীতি ম্যাচে নিজেদের ঝালিয়ে নেবে আনচেলত্তির দল। এরপর ১৩ জুন মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে ব্রাজিলের আসল বিশ্বকাপ অভিযান।
