ঢাকার ঢেঁকি

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৬, ০৬:৫৪ এএম

গাছ-গাছালির ছায়াঘেরা একটি গেরস্তবাড়ি। বাড়িটির চারদিকে পাটখড়ির বেড়া। ভেতরে একটি নড়বড়ে ছনের ঘর। ঘরের সামনে একটি ছোট্ট উঠান। উঠানের এক কোনায় ঢেঁকিতে ধান ভানায় ব্যস্ত এক গৃহবধূ ও তিন কিশোরী। সবার গায়ে সাদা সুতি শাড়ি। দেখে মনে হয়, এটি কোনো অজপাড়াগাঁয়ের দৃশ্য। বাস্তবে না। এই দৃশ্য খোদ ঢাকা শহরের। আজ থেকে ১২৫ বছর আগে ১৯০১ সালে ছবিটি তুলেছেন বিখ্যাত জার্মান আলোকচিত্রী ফ্রিৎজ ক্যাপ। ক্যাপ তখন স্থায়ী বসবাসের জন্য সবে ঢাকায় এসেছেন। ঢাকার সবকিছুই তার চোখে নতুন। ছবির বিষয় হিসেবে গ্রামের পরিবেশ বিদেশি আলোকচিত্রীর কাছে বেশ আকর্ষণীয়। তখন বিশ শতকের গোড়ার দিকে ঢাকায় বসবাসকারী সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন কেমন ছিল তা অনুধাবন করতে হলে ফ্রিৎজ ক্যাপের তোলা এই ছবির দিকে চোখ রাখতে হবে।

ফ্রিৎজ ক্যাপ ধান ভানার যে ছবি তুলেছিলেন তা দিয়ে তিনি পোস্টকার্ড ছাপানোর উদ্যোগ নিলেন। ওই বছরই তিনি ছাপিয়ে ফেললেন পোস্টকার্ড। ছাপানোর আগে সাদাকালো ছবিটির নিচের অংশের বাঁ পাশে নিজ হাতে লিখলেন ‘হাসকিং পেডি উইথ ঢেঁকি।’ আর ডানপাশে দিলেন স্বাক্ষর। স্বাক্ষরের নিচে লিখলেন ঢাকা (উধপপধ)। ক্যাপ যখন এই উদ্যোগ নেন তার দুই দশক আগে ১৮৭৯ সালে অবিভক্ত ভারতে পোস্টকার্ডের প্রচলন শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু পূর্ববঙ্গ তখন ছিল অনেকটাই পিছিয়ে। শুরুতে অবশ্য পোস্টকার্ডে ছবির ব্যবহার ছিল না। পরবর্তী সময়ে ছবি যুক্ত হয়।

ফ্রিৎজ ক্যাপই ছবি সংবলিত পোস্টকার্ডের মাধ্যমে ঢাকার দৃশ্য প্রথম বিশ^বাসীর সামনে তুলে ধরেন। ক্যাপের পোস্টকার্ডটি তৎকালীন বোম্বে বন্দর থেকে বিলাতের উদ্দেশ্যে পোস্ট করা হয়। বর্তমানে এই কার্ডটি ব্রিটিশ লাইব্রেরির সাবেক কর্মকর্তা ও দক্ষিণ এশিয়ার মুদ্রণ ইতিহাস বিশেষজ্ঞ গ্রাহাম শ-এর ব্যক্তিগত সংগ্রহে রয়েছে। ঢাকার ছবি সংবলিত এই কার্ডটি পোস্টকার্ড দুনিয়ার প্রাচীনতম নিদর্শন বলে তারেক আজিজ তার সেকালের ছবিওয়ালা গ্রন্থের ৬৪ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন।

উনিশ শতকের শেষ দশক থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত পূর্ববঙ্গ তথা ঢাকার যত দুর্লভ ছবি দেখা যায় তার বেশির ভাগই ফ্রিৎজ ক্যাপের তোলা। ওই সময়ে বাংলা কিংবা বাঙালির জীবনাচরণ প্রত্যক্ষ করতে চাইলে ক্যাপের তোলা ছবির ওপরই ভর করতে হয়। ঢাকায় স্টুডিও পরিচালনা করলেও ক্যাপ নিজেকে ‘ট্রাভেলিং ফটোগ্রাফর’ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তার স্টুডিওর বিজ্ঞাপনেও সে রকম পরিচয়েরই উল্লেখ পাওয়া যায়।

ক্যাপ ঢাকায় আসেন নবাব খাজা আহসানউল্লাহর আহ্বানে। ১৯০০ সাল বা তার আগের বছর ঢাকায় এসে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। আহসানউল্লাহর সঙ্গে ক্যাপের পরিচয় ফটোগ্রাফিরসূত্রে, ১৮৮৯ সালে কলকাতায়। আহসানউল্লাহ তখনো নবাব হননি। তার বাবা খাজা আবদুল গনি ছিলেন ঢাকার নবাব। শৌখিন আলোকচিত্রী হিসেবে আহসানউল্লাহর তখন বেশ নামডাক। তিনি তখন ফটোগ্রাফিক সোসাইটি অব ইন্ডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। এই সোসাইটির পরিচালকমণ্ডলীর সদস্যদের মধ্যে তিনিই একমাত্র ভারতীয়। কলকাতার ২৯ নম্বর চৌরঙ্গী রোডে ছিল ক্যাপের বিশাল স্টুডিও ‘মেসার্স এফ. কাপ অ্যান্ড কোম্পানি’। ক্যাপ তার নিজের প্রতিষ্ঠানের দুটি কক্ষ বিনা ভাড়ায় সোসাইটিকে ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। সেই সূত্রেই ক্যাপের সঙ্গে আহসানউল্লাহর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

১৮৯৬ সালে আহসানউল্লাহ উত্তরাধিকারসূত্রে ঢাকার নবাব হন। ঢাকা তখন একেবারেই অবহেলিত। এই শহরে তখন বিদ্যুৎ পর্যন্ত ছিল না। নবাব হওয়ার পর তিনি এই জনপদের উন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ফটোগ্রাফিশিল্পের একজন সমঝদার হিসেবে তিনি ক্যাপকে ঢাকায় এসে স্থায়ীভাবে বসবাসের আহ্বান জানান। ক্যাপ তখন দুটি স্টুডিও পরিচালনা করতেন। একটি ছিল কলকাতার চৌরঙ্গীতে, আরেকটি দার্জিলিংয়ে। নবাবের পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকায় এসে ৮ নম্বর ওয়াইজঘাট সড়কে তিনি গড়ে তোলেন একটি আধুনিক স্টুডিও। ক্যাপের এই স্টুডিওর আগে ঢাকায় কোনো বাণিজ্যিক স্টুডিও ছিল বলে, ইতিহাসে তার প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে ক্যাপের স্টুডিওর আগে তৎকালীন ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ মহকুমার বগজুরি গ্রামে ‘এইচ এল সেন ব্রাদার্স’ নামে হীরালাল সেনের একটি স্টুডিও ছিল। হীরালালের স্টুডিওটি বাণিজ্যিক না কী তার আলোকচিত্র গবেষণার জন্য ব্যবহৃত হতো এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না।

২০২১ সালের ১৯ জুন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর সাপ্তাহিক প্রকাশনা ইজেল-এ ‘পোস্টকার্ড পূর্ববঙ্গ’ শিরোনামের প্রবন্ধে তারেক আজিজ উল্লেখ করেন, ‘ঢাকায় তার [ফ্রিৎজ ক্যাপ] স্টুডিওর ফটোগ্রাফি সীমিত ছিল মূলত ঢাকার ইউরোপীয় অধিবাসী আর স্থানীয় জমিদার ও অবস্থাপন্ন পরিবারের ভেতরে। ঢাকার নবাবের পারিবারিক ফটোগ্রাফার হওয়ার সুবাদে ফ্রিৎজ ক্যাপ আহসান মঞ্জিল ও এর অধিবাসীদের প্রচুর ছবি যেমন তুলেছেন তেমনি এ অঞ্চলের বহু গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান এবং ঘটনাও ক্যামেরাবন্দি করেছেন।’

ফ্রিৎজ ক্যাপ এ দেশে এসেছিলেন নবাবের বিশেষ অনুরোধে। কিন্তু তার ছবি তোলার চর্চা রাজপ্রাসাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি ক্যামেরা নিয়ে চলে গেছেন একেবারে মাটির কাছে, সাধারণ মানুষের দুয়ারে। নিজের দেশের মতো এ দেশকে তিনি ভালোবেসে ছিলেন। তাই তার তোলা ছবিতে আবহমান বাংলার প্রাণময়তা পাওয়া যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত