‘আমি তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কোচিং সেন্টার বলি’ একটি পডকাস্টে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের এমন মন্তব্য দেশজুড়ে বিতর্কের জন্ম দেয়। বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের মন্তব্য প্রত্যাহার করেন। শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষকরা বলেন, এ ধরনের মন্তব্য দেশের সর্বোচ্চ ও ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অসম্মানজনক।
প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের অসম্মানজনক মন্তব্যের পরও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন র্যাংকিংয়ের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এখনো দেশের শীর্ষস্থানে রয়েছে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
পডকাস্টে ববি হাজ্জাজের সাম্প্রতিক বক্তব্যটি এ রকম ‘আমি তো বলি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি কোচিং সেন্টার; এটি মূলত কোচিং ইউনিভার্সিটি।’ তিনি বলেন, ‘দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাঠদানকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে এবং গবেষণার ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।’ তার দাবি, গবেষণা ও প্রকাশনার কিছু সূচকে কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও ভালো অবস্থানে রয়েছে।
তার এ বক্তব্য দ্রুত ভাইরাল হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য, গবেষণা ও জাতীয় জীবনে অবদানের প্রসঙ্গ টেনে অনেকেই প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘অবমাননাকর’ ও ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাহারের দাবি জানান।
এ পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমার আংশিক বক্তব্যটি যেহেতু কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করেছে, অনেকেই অসন্তুষ্ট হয়েছেন, আমার অনেক প্রিয়জন ও শুভাকাক্সক্ষী মর্মাহত হয়েছেন, সেজন্য আমার বক্তব্য আমি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে নিচ্ছি এবং আশা করি, এরপর এ বিষয়ে আর কোনো বিতর্ক ও ভুল বোঝাবুঝি থাকবে না।’
১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও
সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অন্যতম নির্মাতা। ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থান, ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায়ে এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে।
সাম্প্রতিক গবেষণা, প্রকাশনা ও আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ের সূচকগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নানা সীমাবদ্ধতা ও অর্থ সংকটের মধ্যেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনো দেশের শীর্ষ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ২০২৫ সালে স্কোপাস ইনডেক্সড জার্নালে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক ও গবেষকরা ১ হাজার ৭৮৯টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন, যা বাংলাদেশের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সর্বোচ্চসংখ্যক। একই সময়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা ছিল ৮০৪টি ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা ছিল ৭৭৮টি।
আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়েও প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে। ২০২৬ সালের কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বে ৫৮৪তম স্থান অর্জন করে দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ধরে রেখেছে। একই সঙ্গে কিউএস এশিয়া ইউনিভার্সিটি র্যাংকিংয়ে এশিয়ার মধ্যে ১৩২তম স্থান অর্জন করে বাংলাদেশে প্রথম হয়েছে। টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২০০ ধাপ এগিয়ে ৮০১-১০০০-এর মধ্যে অবস্থান নিশ্চিত করেছে।
টাইমস হায়ার এডুকেশনের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রিসার্চ এনভায়রনমেন্ট’ স্কোর মাত্র ১৩.৩ হলেও ‘রিসার্চ কোয়ালিটি’ স্কোর ৭৬.৫। অর্থাৎ, গবেষণা তহবিল, অবকাঠামো ও গবেষণা সহায়ক পরিবেশের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তুলনায় পিছিয়ে থাকলেও গবেষণার মানের ক্ষেত্রে সে ব্যবধান তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
বিশ্লেষকদের মতে, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে শুধু গবেষণাপত্রের সংখ্যা বা ফলাফল নয়, বরং ফল অর্জনের পেছনে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, অবকাঠামোগত সুবিধা এবং গবেষণা সহায়ক পরিবেশকে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনা করলে বৈষম্যের চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেখানে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় বছরে প্রায় ১২ হাজার ৫৩৬ কোটি, অক্সফোর্ড ১২ হাজার ৮০০ কোটি, মেলবোর্ন ১৩ হাজার ৮২৫ কোটি, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর ৮ হাজার ৭৮০ কোটি, টোকিও ৭ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা এবং ভারতের আইআইটি মাদ্রাজ প্রায় ১ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা গবেষণা খাতে ব্যয় করে, সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বরাদ্দ মাত্র ২১ কোটি টাকার কাছাকাছি। অর্থাৎ, বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তুলনায় কয়েকশ গুণ কম অর্থায়নে গবেষণা করতে হয় দেশের সবচেয়ে পুরনো ও বৃহৎ এ বিশ্ববিদ্যালয়কে।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, যে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও গবেষণা অবকাঠামোই পায় না, তার কাছ থেকে হার্ভার্ড বা অক্সফোর্ডের মানের গবেষণা আশা কতটা বাস্তবসম্মত? শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের বক্তব্যটি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হলে মুহূর্তেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান-সাবেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা ব্যাপকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘আমি তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলি কোচিং সেন্টার, এখানে থামলে আমি অতটা আঁতকে উঠতাম না। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিম্নমুখী হওয়ার বিষয়টি আমিও বলে আসছি। তবু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা এখনো যেকোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে অনেক ওপরে।’
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আনোয়ারুল আজিম এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাৎসরিক বাজেট ঘাটতি ৮০ কোটি টাকার বেশি। দেশের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক দুরবস্থাকে আড়াল করে যে বা যারা র্যাংকিং, গবেষণার সংখ্যা, মান প্রভৃতি নিয়ে উচ্চমার্গীয় কথাবার্তা বলবে, বুঝে নেবেন সে সঠিক তথ্য না জেনে মূর্খতা প্রকাশ করছে অথবা জেনে ভ-ামি করছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেরই ৩৫০০-এর বেশি স্নাতক ডিগ্রি প্রদানকারী বিশ্ববিদ্যালয় অথবা সমপর্যায়ের প্রতিষ্ঠানের র্যাংকিং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিচে।’
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক শাকির আহমেদ বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমালোচনা করলে জাতে ওঠা যায়, আলোচনায় থাকা যায় এমন একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। গবেষণা, র্যাংকিং কিংবা অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের ক্রান্তিলগ্নে বারবার নেতৃত্ব দিয়েছে।’