ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্তবর্তী তিনটি উপজেলা কসবা, আখাউড়া ও বিজয়নগর ফলের রাজ্য হিসেবে খ্যাত। জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে সীমান্তবর্তী বিজয়নগর, কসবা ও আখাউড়া উপজেলার পাহাড়ি টিলাভূমি ও মাটি লাল হওয়ায় এই অঞ্চলে চলতি মৌসুমে কাঁঠালের বাম্পার ফলন হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলায় ৯৯২ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের আবাদ করা হয়েছে। এ বছর ২১ কোটি ৬ লাখ টাকার কাঁঠাল বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূল থাকার পাশাপাশি কৃষকেরা সঠিকভাবে বাগানের পরিচর্চা করায় এ বছর কাঁঠালের ভালো ফলন হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে ভালো দাম পেয়ে খুশি বাগান মালিকেরা। অন্যদিকে দাম হাতের নাগালে থাকায় ক্রেতারাও স্বস্তিতে।
জানা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের পূর্ব এবং দক্ষিণাঞ্চলের সীমান্তবর্তী লাল পাহাড়ি ও টিলাভূমির মাটিতে কাঁঠালের বাম্পার ফলন হয়েছে। মধু মাসে জেলার বিজয়নগর উপজেলার বিষ্ণপুর, কালাছড়া, ছতরপুর, পাহাড়পুর, মেরাসানি, আউলিয়া বাজার, চাঁনপুর, মুকুন্দপুর, খাটিংগা, দাড়িয়াপুর, নিদারাবাদ, সোনামুড়া, চম্পকনগর, আদমপুর, সিঙ্গারবিল ও কসবা উপজেলার গোপীনাথপুর, বায়েক, মন্দবাগ, কায়েমপুর এবং আখাউড়া উপজেলার আজমপুর, আমোদাবাদ, রাজাপুর এলাকার প্রতিটি জনপদসহ বাগানগুলোতে ঝুলে আছে ছোট-বড় কাঁঠাল। আবহাওয়া অনুকূলে থাকার পাশাপাশি রোগ বালাই থেকে মুক্ত হওয়ায় পরিপক্ব অবস্থায় বাগান থেকে কাঁঠাল বাজারজাত করা হচ্ছে। কৃষকেরা জানান, রসাল ও মিষ্টি হওয়ায় বাজারে লাল মাটির কাঁঠালের বেশ চাহিদা রয়েছে। বাগান থেকে পাইকাররা প্রতি ১০০ পিস কাঁঠাল সাইজ অনুযায়ী বিভিন্ন দামে কিনে নিচ্ছেন। এতে বেশ লাভবান হচ্ছেন বাগান মালিকেরা। এসব বাগান থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন উপজেলা, পার্শ্ববর্তী কুমিল্লা, নরসিংদী, ভৈরব, শ্রীমঙ্গল, হবিগঞ্জ, শায়েস্তাগঞ্জ, চুনারুঘাটের ব্যবসায়ীরা কাঁঠাল কিনে বিভিন্ন যানবাহনে করে নিয়ে যায়।
বিজয়নগরের পাহাড়পুর গ্রামের বাগান মালিক তাসরিফ ইসলাম জানান, এবার ফলন ভালো হয়েছে। প্রতি দিনই ১০০-২০০ কাঁঠাল কাটা হচ্ছে। প্রতি ১০০ কাঁঠাল সাইজ অনুযায়ী বিক্রি হচ্ছে। প্রতিদিনই কাঁঠাল নিতে বিভিন্ন জায়গা থেকে পাইকাররা আসছেন। তারা এসব কাঁঠাল বিভিন্ন বাজারে নিয়ে বিক্রি করবেন। ফলন ভালো হওয়ার চাষিরা লাভবান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিজয়নগর এলাকার মাটির গুণাগুণ ভালো হওয়ায় কাঁঠালের ফলনও ভালো হয়েছে।
সোহাগ মিয়া নামে এক কাঁঠাল ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা আগেই কাঁঠাল বাগান কিনে রেখেছিলাম। প্রতি ১০০ কাঁঠাল ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা দরে কিনেছিলাম। এখন কাঁঠাল পরিপক্ব হওয়ায় পাইকারেরা বিভিন্ন জায়গা থেকে বাগানে আসতেছে। পাইকারদের কাছে ১০০ কাঁঠাল বিক্রি করছি ৮-১০ হাজার টাকা দরে। যদি এই দাম আগামী তিন মাস থাকে তাহলে ভালো লাভবান হব।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের আনন্দবাজারের কাঁঠাল বিক্রেতা আব্দুল করিম বলেন, ‘আমি এখানে বিজয়নগর উপজেলার বিষ্ণপুর, কালাছড়া, ছতুরপুর, পাহাড়পুর, মেরাসানি, আউলিয়া বাজার এলাকা থেকে কাঁঠাল নিয়ে এখানে আসি। বাজারে প্রতিদিন আড়াইশ থেকে ৩০০ কাঁঠাল বিক্রি করি। এখানকার মানুষ অন্য এলাকার চেয়ে বিজয়নগরের কাঁঠাল বেশি পছন্দ করে। এখানে কাঁঠালের সাইজ দেখে দাম করা হয়। কাঁঠাল বিক্রি করে আমরাও লাভবান।’
কাঁঠাল কিনতে আসা স্থানীয় বিকাশ মুন্না বলেন, ‘বিজয়নগরের কাঁঠাল সবারই পছন্দের। এসব এলাকার কাঁঠাল মানুষ কিনে বেশি। আমিও এসেছি কাঁঠাল কেনার জন্য।’ ব্রাহ্মণবাড়িয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ অফিসার মুনসী তোফায়েল হোসেন বলেন, ‘মাটির গুণাগুণ ভালো হওয়ায় চলতি বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ৯৯২ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের চাষ করা হয়েছে। এ বছর ২১ কোটি ৬ লাখ ৯ হাজার টাকার কাঁঠাল বিক্রি করা হবে। চলতি বছরে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হয়েছে, তাই সম্ভাবনা অর্জিত হবে। জেলার বিজয়নগর, কসবা ও আখাউড়া উপজেলা পাহাড়ি টিলাভূমি সমৃদ্ধ লাল মাটি (অমিøøও মাটি) হওয়ায় সেখানের কাঁঠাল বেশি ভালো হয়। এই অঞ্চলে কাঁঠালের আবাদ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
