সাফের হ্যাটট্রিক শিরোপা হলো না বাংলাদেশের, ভারত চ্যাম্পিয়ন

আপডেট : ০৬ জুন ২০২৬, ০৯:১২ পিএম

আরব সাগরের তীরে এসে থেমে গেল বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রা। দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলে নতুন ইতিহাস গড়ে টানা তৃতীয়বার সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার যে স্বপ্ন নিয়ে গোয়ায় এসেছিলেন মারিয়া মান্দারা, তা শেষ পর্যন্ত পূরণ হলো না। সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে স্বাগতিক ভারতের কাছে ৩-১ গোলে হেরে রানার্সআপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে লাল-সবুজ প্রতিনিধিদের। সাফে এটি ভারতের ষষ্ঠ শিরোপা। 

রাতে গোয়ার পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে শুরু থেকেই ছিল দুই দলের আক্রমণাত্মক ফুটবলের লড়াই। তবে শিরোপা পুনরুদ্ধারের দৃঢ় সংকল্প নিয়ে মাঠে নামা ভারত শেষ পর্যন্ত সুযোগগুলো কাজে লাগিয়ে ট্রফি নিজেদের ঘরে তুলেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি সুযোগ পেয়েও সেগুলো কাজে লাগাতে না পারায় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেনি।

ফাইনালের আগে বাংলাদেশ শিবিরে নানা প্রতিকূলতা ছিল। ইনজুরিতে জর্জরিত ছিলেন দলের অন্যতম ভরসা মনিকা চাকমা। পুরো টুর্নামেন্টেই তিনি নিজের সেরা ছন্দে ফিরতে পারেননি। মাঝমাঠে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি অধিনায়ক আফঈদা খন্দকারও। দলে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং টুর্নামেন্টজুড়ে একাদশে ঘন ঘন পরিবর্তনের প্রভাবও স্পষ্টভাবে দেখা গেছে মাঠের খেলায়। যে বাংলাদেশ গত কয়েক বছর ধরে ছন্দময় ও আত্মবিশ্বাসী ফুটবল উপহার দিয়েছে, গোয়ার ফাইনালে দেখা গেল তার ভিন্ন এক রূপ।

গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে একাদশে দুটি পরিবর্তন আনেন বাংলাদেশের ব্রিটিশ কোচ পিটার জেমস বাটলার। সেমিফাইনালে খেলা দল থেকে বাদ পড়েন সুরভী আকন্দ প্রীতি ও উমহেলা মারমা। তাদের জায়গায় সুযোগ পান অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড শামসুন্নাহার জুনিয়র এবং তহুরা খাতুন। এছাড়া গ্রুপ পর্বে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে প্রথম একাদশে না থাকা আফঈদা খন্দকারকেও শুরু থেকেই মাঠে নামান বাটলার।

ম্যাচের শুরু থেকেই গোলের খোঁজে ছিল দুই দল। তবে প্রথম দিকের কয়েকটি ভালো সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশই। ১২ মিনিটে তহুরা খাতুনের দারুণ ক্রসে বল পেলেও গোলমুখে দাঁড়িয়ে তা কাজে লাগাতে পারেননি শামসুন্নাহার জুনিয়র। দুই মিনিট পর তহুরা নিজেই গোলরক্ষকের মুখোমুখি হয়েও লক্ষ্যভেদে ব্যর্থ হন। এই দুটি সুযোগই পরে বাংলাদেশের জন্য আক্ষেপ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রথমার্ধের শেষ দিকে এসে ম্যাচে এগিয়ে যায় ভারত। ৪২ মিনিটে পেয়ারি শাশাকে ঠেকাতে ব্যর্থ হন বাংলাদেশের রক্ষণভাগের খেলোয়াড়রা। সুযোগ বুঝে জালে বল পাঠিয়ে স্বাগতিকদের এগিয়ে দেন তিনি। গোল হজমের পরও হাল ছাড়েনি বাংলাদেশ। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে ঋতুপর্ণা চাকমা অসাধারণ এক ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে সমতায় ফেরান দলকে। বাঁ প্রান্ত দিয়ে বক্সে ঢুকে নেওয়া তার কোনাকুনি শট ভারতীয় গোলরক্ষককে পরাস্ত করে জালে জড়ালে ১-১ সমতায় শেষ হয় প্রথমার্ধ।

বিরতির পর ম্যাচের চিত্র দ্রুত বদলে যায়। ৪৭ মিনিটে সানফিদা নংরুমের শট ঠেকাতে গিয়ে বিপাকে পড়েন গোলরক্ষক মিলি আক্তার। তার হাত ছুঁয়ে বল ক্রসবারে লেগে জালে প্রবেশ করলে আবারও এগিয়ে যায় ভারত (২-১)। এই গোল বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের ওপর মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।

পিছিয়ে পড়ার পর সমতায় ফেরার চেষ্টা চালায় বাংলাদেশ। ৫৬ মিনিটে মারিয়া মান্দার জোরালো শট গোললাইন থেকে ফিরিয়ে দেন ভারতের এক ডিফেন্ডার। সেই সুযোগটি কাজে লাগলে ম্যাচে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হতে পারত। কিন্তু ভাগ্য সেদিন বাংলাদেশের পক্ষে ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তভাবে নিজেদের হাতে নেয় ভারত। ৬৪ ও ৬৫ মিনিটে স্বাগতিকদের পরপর দুটি প্রচেষ্টা অল্পের জন্য বাইরে চলে না গেলে ব্যবধান আরও বাড়তে পারত। অন্যদিকে বাংলাদেশের আক্রমণে ছিল না প্রয়োজনীয় ধার। ম্যাচে ফেরার লক্ষ্যে কোচ বাটলার দ্বিতীয়ার্ধে মনিকা চাকমা ও সাগারিকা আক্তারকে মাঠে নামালেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।

শেষদিকে রক্ষণাত্মক কৌশল নিয়ে খেললেও ভারতের আক্রমণ থামেনি। ৮৩ মিনিটে লিন্ডা কম সার্তোরের গোল বাংলাদেশের শেষ আশাটুকুও নিভিয়ে দেয়। ৩-১ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পর আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি লাল-সবুজের মেয়েরা। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের শিরোপা উৎসব শুরু হয়, আর বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে অপূর্ণ স্বপ্নের হতাশা।

২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠেছিল বাংলাদেশ। সেবারও প্রতিপক্ষ ছিল ভারত এবং হার নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয়েছিল। এরপর ২০২২ ও ২০২৪ সালে নেপালকে হারিয়ে টানা দুইবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ। তবে এবার আরব সাগরের তীরে এসে থেমে গেল সেই স্বপ্নযাত্রা। হ্যাটট্রিক শিরোপার বদলে রানার্সআপ ট্রফি নিয়েই দেশে ফিরতে হবে মারিয়া, ঋতুপর্ণা, আফঈদা ও তাদের সতীর্থদের।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত