অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করেছে ইসলাম

আপডেট : ০৯ জুন ২০২৬, ০৭:২৭ এএম

মানবসমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য অপরাধ দমন অপরিহার্য। যেখানে অপরাধীর বিচার হয় না, সেখানে জুলুম-অত্যাচার বৃদ্ধি পায় এবং মানুষের জানমাল ও সম্মান নিরাপদ থাকে না। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং অপরাধীর যথাযথ বিচার নিশ্চিত করার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। কোরআন-হাদিসে এমন বহু নির্দেশনা রয়েছে, যা প্রমাণ করে, ইসলাম কোনো অপরাধীকে ছাড় দেয় না, বরং ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন।’ (সুরা নাহল ৯০)

অপর স্থানে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা ন্যায়ের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে আল্লাহর জন্য সাক্ষীরূপে, যদিও তা তোমাদের নিজদের কিংবা পিতা-মাতার অথবা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে হয়।’ (সুরা নিসা ১৩৫)

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়, ইসলামে বিচারকার্যে আত্মীয়তা, ক্ষমতা, সম্পদ কিংবা সামাজিক মর্যাদা কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতেই বিচার হতে হবে।

ইসলাম মানুষের জীবন, সম্পদ, সম্মান ও ধর্মীয় স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এসব অধিকারের ওপর আঘাত করা অপরাধ হিসেবে গণ্য। তাই হত্যাকাণ্ড, চুরি, ডাকাতি, ব্যভিচার, মিথ্যা অপবাদ, দুর্নীতি, ঘুষ, প্রতারণা ইত্যাদির জন্য ইসলাম নির্দিষ্ট শাস্তির বিধান দিয়েছে। এসব শাস্তির মূল উদ্দেশ্য অপরাধ দমন, সমাজে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যৎ অপরাধ প্রতিরোধ।

মানুষের জীবন রক্ষার ব্যাপারে ইসলাম অত্যন্ত কঠোর। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করা কিংবা পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন সব মানুষকে হত্যা করল। আর যে কাউকে বাঁচাল, সে যেন সব মানুষকে বাঁচাল।’ (সুরা মায়েদা ৩২)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বিচারকার্যে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্বকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন। একবার কুরাইশ বংশের এক সম্ভ্রান্ত নারী চুরির অপরাধে অভিযুক্ত হলে কিছু লোক তার শাস্তি মওকুফের জন্য সুপারিশ করতে আসে। তখন নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছে এ কারণে যে, তাদের মধ্যে কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি চুরি করলে তাকে ছেড়ে দিত, আর দুর্বল ব্যক্তি চুরি করলে তার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম! মুহাম্মদের কন্যা ফাতেমাও যদি চুরি করত, তবে আমি তার হাতও কেটে দিতাম।’ (সহিহ বুখারি)

এই হাদিস ইসলামের ন্যায়বিচারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এখানে স্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান।

ইসলাম বিচারকার্যে প্রমাণ ও সাক্ষ্যের গুরুত্বও অত্যন্ত বেশি দিয়েছে। কোনো ব্যক্তিকে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে শাস্তি দেওয়া যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা অধিক অনুমান থেকে বেঁচে থাকো, নিশ্চয়ই কোনো কোনো অনুমান পাপ।’ (সুরা হুজুরাত ১২)

ইসলাম শুধু অপরাধীর শাস্তির কথা বলেনি, বরং নিরপরাধ ব্যক্তির অধিকার রক্ষার ব্যাপারেও অত্যন্ত সতর্ক করেছে। মিথ্যা অভিযোগ ও মিথ্যা সাক্ষ্যকে বড় গুনাহ বলা হয়েছে। (সহিহ বুখারি)

মিথ্যা সাক্ষ্য বিচারব্যবস্থাকে ধ্বংস করে এবং প্রকৃত অপরাধীকে রক্ষা করে। তাই ইসলাম এ অপরাধকে অত্যন্ত ভয়াবহ বলে আখ্যায়িত করেছে।

ইসলামের বিচারব্যবস্থার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো জবাবদিহি। বিচারক, শাসক কিংবা সাধারণ মানুষ কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রা.)-এর যুগে সাধারণ মানুষও তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করতে পারত। এটি প্রমাণ করে, ইসলামে ক্ষমতাবানদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হয়।

লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত