কুড়িগ্রাম, সিলেট ও জামালপুর সহ দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে লোকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর (পুশ ইন) চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী। আর এসব সীমান্তে বিজিবি ও এলাকাবাসীর যৌথ পাহারা, টর্চলাইটের আলো এবং সতর্ক অবস্থানের মুখে শেষ পর্যন্ত ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এই পুশইন চেষ্টা চালাতে ব্যর্থ হয়।
সীমান্তের একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, ভারতের আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাংলাভাষী মুসলিম ও অন্যান্য বাসিন্দাদের 'বাংলাদেশি' আখ্যা দিয়ে আটক করছে সে দেশের পুলিশ। আটককৃত নারী, পুরুষ ও শিশুদের প্রথমে বিভিন্ন জেলার হোল্ডিং সেন্টারগুলোতে রাখা হয় এবং পরবর্তীতে তাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে বিএসএফ তাদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে।
স্থানীয় ও বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (৮ জুন) বিকেল থেকে শুরু করে মঙ্গলবার (৯ জুন) সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত কুড়িগ্রাম উপজেলার ভুন্দুরচর, উত্তর বারবান্দা, বড়াইবাড়ি, ঝাউবাড়ি, বকবান্ধা ও খেওয়ারচর সীমান্তের আন্তর্জাতিক সীমানা ১০৬৫-১০৬৯ নম্বর মেইন পিলার সংলগ্ন নো-ম্যান্স ল্যান্ড এলাকায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করে। পুশইনের আশঙ্কায় সোমবার বিকেল থেকেই বিজিবির পাশাপাশি শত শত স্থানীয় বাসিন্দা লাঠিসোঁটা ও টর্চলাইট নিয়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে শক্ত পাহারায় বসেন। সারারাত ধরে চলা এই যৌথ প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে বাধ্য হয়।
বকবান্দা গ্রামের বাসিন্দারা জানান, রাতে নারী ও শিশুসহ প্রায় ৩০ ভারতীয় নাগরিককে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। বিষয়টি টের পেয়ে সীমান্ত লাগোয়া গ্রামের লোকজন তাৎক্ষণিকভাবে বিজিবিকে খবর দেয়। পরে বিজিবি সদস্য ও স্থানীয়রা একজোট হয়ে এই পুশইনের প্রচেষ্টা শক্ত হাতে প্রতিরোধ করেন।
জানা যায়, ভারতের মানকাচর ও বাংলাদেশের বকবান্দা সীমান্তের ১০৬৯ নম্বর মেইন পিলার সংলগ্ন এলাকায় বিএসএফ অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালিয়েছিল। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জামালপুর-৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধীনস্থ রৌমারী উপজেলার খেওয়ারচর বিওপির বিজিবি সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং স্থানীয় গ্রামবাসীদের সঙ্গে নিয়ে সীমান্তে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলেন।
কুড়িগ্রাম-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমিন বলেন, পুশইন ঠেকাতে আমাদের বড়াইবাড়িসহ আশপাশের গ্রামের সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিজিবিকে সহযোগিতা করছে। ভারত যাতে কোনোভাবেই কোনো লোককে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করাতে না পারে, সে জন্য সবাই সতর্ক।
অন্যদিকে জানা যায়, গত রবিবার (৭ জুন) গভীর রাতে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার পাররামরামপুর ইউনিয়নের রহিমপুর গ্রামের বিপরীতে সীমান্তের ১০৮০ নম্বর পিলার এলাকায় কয়েকটি ভারতীয় গাড়ি ও বিএসএফ সদস্যদের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এ সময় গ্রামবাসীর মধ্যে সন্দেহ ও উদ্বেগ তৈরি হয়। পরে রাতভর বিজিবির সদস্যদের সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দারা লাঠিসোঁটা ও টর্চলাইট নিয়ে অবস্থান নেন।
পাররামরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সেলিম মিয়া বলেন, রহিমপুর এলাকার সীমান্তবর্তী ১০৮০ নম্বর পিলার এলাকায় ভারতের গেটে বিএসএফ দুটি পিকআপে লোকজন নিয়ে অবস্থান নেয়। খবর পেয়ে আমরাও ওই এলাকায় গিয়ে মাইকিং করে গ্রামবাসীকে জড়ো করলে বিএসএফ এক পর্যায়ের পিকআপ দুটি সরিয়ে নেয়। তারপর থেকে আমাদের সীমান্তবর্তী এই এলাকার বাসিন্দা ও গ্রাম পুলিশ বিজিবি সদস্যদের সঙ্গে রয়েছেন।
জামালপুর ৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান বলেন, বিএসএফ ওই দিক দিয়ে পুশ ইনের চেষ্টা করেছিল। গ্রামবাসীকে নিয়ে আমাদের সতর্ক অবস্থানের কারণে তারা পুশ ইন করাতে পারেনি। সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
ভারত থেকে অবৈধভাবে ঠেলে পাঠানো (পুশ ইন) এবং অন্যান্য সীমান্তে অপরাধ প্রতিরোধে সিলেট, সুনামগঞ্জের কিছু অংশসহ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ৩০২ কিলোমিটারজুড়ে এলাকায় সতকর্তা জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি)।
সিলেট ৪৮ বিজিবি ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হক বলেন, বিজিবি সিলেট সেক্টরের অধীন সীমান্তের ৩০২ কিলোমিটারে পালা করে ২৪ ঘণ্টা কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে।