আজ ৯ জুন। আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে আজকের দিনটি লিওনেল মেসি এবং আর্জেন্টিনার সমর্থকদের জন্য এক অবিস্মরণীয় মুহূর্তের স্মারক। ঠিক ১৪ বছর আগে, ২০১২ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা। প্রীতি ম্যাচ হলেও চিরবৈরী দুই প্রতিবেশীর সেই লড়াই রূপ নিয়েছিল ফুটবলের মহাকাব্যে। যেখানে সেলেসাওদের ৪-৩ ব্যবধানে হারিয়ে মাঠ ছেড়েছিল আলবিসেলেস্তেরা, আর ম্যাচের ভাগ্য একাই নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন ‘ভিনগ্রহের ফুটবলার’ লিওনেল মেসি।
ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের (ইউরো ২০১২) জার্মানি বনাম পর্তুগালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের ভিড়েও সেদিন নিউ জার্সিতে ৮০ হাজারেরও বেশি দর্শক উপস্থিত হয়েছিলেন কেবল মেসি ও নেইমারের দ্বৈরথ দেখতে। ম্যাচটি তখন পরোক্ষভাবে রূপ নিয়েছিল পেলে ও ডিয়েগো ম্যারাডোনার মধ্যকার এক ‘ঠান্ডা যুদ্ধে’। পেলে দাবি করেছিলেন নেইমারই সেরা, যার জবাবে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, "নেইমার হয়তো বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়, তবে সেটা কেবল তখনই সত্যি হবে যদি আপনি মেনে নেন যে মেসি এই গ্রহের বাসিন্দা নন, অন্য কোনো গ্রহের!" মাঠের লড়াইয়ে ম্যারাডোনার সেই উক্তিকেই যেন সত্য প্রমাণ করেছিলেন এলএমটেন।
ম্যাচটি কাগজে-কলমে ‘প্রীতি ম্যাচ’ হলেও মাঠের উত্তেজনা ছিল ভিন্ন স্তরের। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার ঠিক আগ মুহূর্তে আর্জেন্টিনার এজিকিয়েল লাভেজ্জি ব্রাজিলের মার্সেলোকে লাথি মারলে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে তুমুল হাতাহাতি শুরু হয়। রেফারি দুজনকে লাল কার্ড দেখালেও স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরো মাঠ জুড়ে নিরাপত্তা কর্মীদের বাউন্ডারি তৈরি করতে হয়েছিল।
সাত গোলের রোমাঞ্চকর থ্রিলার
ম্যাচের ২৩ মিনিটে নেইমারের ফ্রি-কিক থেকে রোমুলোর গোলে প্রথমে এগিয়ে যায় ব্রাজিল (১-০)। কিন্তু এর পরেই শুরু হয় মেসি-ম্যাজিক। ৩১ মিনিটে হিগুয়াইনের পাস থেকে বল পেয়ে চমৎকার ফিনিশিংয়ে আর্জেন্টিনাকে সমতায় ফেরান মেসি (১-১)। এর মাত্র তিন মিনিট পর, ৩৪ মিনিটে আনহেল দি মারিয়ার রক্ষণভেদী পাস থেকে বল ধরে ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক রাফায়েল ক্যাব্রালকে বোকা বানিয়ে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন মেসি, আর্জেন্টিনা এগিয়ে যায় ২-১ ব্যবধানে।
দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়ায় ব্রাজিল। ৫৬ মিনিটে অস্কারের গোলে ২-২ এবং ৭২ মিনিটে হুল্কের দুর্দান্ত সাইড-ভলিতে ৩-২ ব্যবধানে লিড নেয় সেলেসাওরা। তবে আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার ফেদেরিকো ফার্নান্দেজ ৭৫ মিনিটে সার্জিও আগুয়েরোর কর্নার থেকে হেডে গোল করে ম্যাচটিকে ৩-৩ সমতায় নিয়ে আসেন।
সেই অবিস্মরণীয় ‘ম্যাজিক গোল’
ম্যাচের আসল রোমাঞ্চ তখনো বাকি ছিল। ৮৫ মিনিটে মাঝমাঠের একটু সামনে ডান প্রান্তের সাইডলাইনের কাছাকাছি বল পান লিওনেল মেসি। বল পায়ে গতি বাড়িয়ে তিনি ব্রাজিলের রক্ষণভাগের দিকে ছুটে যান। বক্সের ঠিক সামনে এসে চমৎকার ড্রিবলিংয়ে ভেতরের দিকে কেটে বাঁ-পায়ের এক বাঁকানো জাদুকরী শটে বল পাঠিয়ে দেন জালের একেবারে ওপরের কোণায়।
উন্মাতাল হয়ে ওঠে পুরো মেটলাইফ স্টেডিয়াম। আর্জেন্টিনার সাইডবেঞ্চের খেলোয়াড়রা উদযাপনের চোটে মাঠের ডিজিটাল সাইনবোর্ড পর্যন্ত ভেঙে ফেলেন। মেসির এই চোখধাঁধানো গোলেই ৪-৩ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত হয় আর্জেন্টিনার।
১৯৮২ সালের পর ব্রাজিলের বিপক্ষে কোনো আর্জেন্টাইনের প্রথম হ্যাটট্রিক। আর মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে দ্বিতীয় হ্যাটট্রিক।
"আমরা ভাগ্যবান ও আর্জেন্টাইন"
ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার তৎকালীন প্রধান কোচ আলেহান্দ্রো সাবেয়া তৃপ্তির হাসি হেসে বলেছিলেন, "আমরা ভাগ্যবান যে ও একজন আর্জেন্টাইন। আমরা ওর এই অবিশ্বাস্য প্রতিভার সুবিধা পাচ্ছি।"
এমনকি নিরপেক্ষতা বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা ভুলে প্রেস বক্সের আমেরিকান সাংবাদিকরাও সেদিন মেটলাইফ স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। ব্রাজিলকে চূর্ণ করা মেসির সেই অবিশ্বাস্য হ্যাটট্রিক আজ ১৪ বছর পরও ফুটবলপ্রেমীদের মনে ঠিক ততটাই সতেজ এবং রোমাঞ্চকর।