অলিস হতে পারে ফ্রান্সের ট্রাম্পকার্ড

আপডেট : ১০ জুন ২০২৬, ০৭:২৬ এএম

বিশ্বকাপে ফ্রান্সের আক্রমণভাগের আলোটা কার ওপর থাকবে? কিলিয়ান এমবাপ্পে? নাকি ব্যালন ডি’অর জয়ী ওসমান দেম্বেলে? হিসাব-নিকাশ বলছে, লাইমলাইট কেড়ে নিতে পারেন সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন। তিনি কোনো উচ্চাভিলাষী প্রচারের আলোয় থাকা তারকা নন; বরং শান্ত, মৃদুভাষী আর মাঠের কাজে মগ্ন এক জাদুকর। নাম তার মাইকেল অলিস। যার পায়ের জাদুকরী প্রথম স্পর্শ (ফার্স্ট টাচ) আর দিক পরিবর্তনের মুহূর্তের গতি প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে মুহূর্তে ছিটকে দেয়।

আগামী ১৬ জুন নিউ জার্সিতে দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স যখন সেনেগালের বিপক্ষে মাঠে নামবে, তখন সবার চোখ থাকবে বায়ার্ন মিউনিখের এই উইঙ্গারের ওপর। সোমবার উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক করে নিজের ফর্মের জানান দিয়েছেন অলিস। ‘লে ব্লুজ’দের হয়ে ১৭ ম্যাচে এটি তার সপ্তম গোল। কোচ দিদিয়ের দেশম তার প্রথম একাদশ নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন, যেখানে এমবাপ্পে, দেম্বেলে কিংবা উদীয়মান তারকা দেজিরে দুয়ের মতো তারকারা ছিলেন। কিন্তু সবাইকে ছাড়িয়ে উজ্জ্বলতম নক্ষত্র হয়ে জ্বললেন অলিস।

দেশম ম্যাচ শেষে অলিসর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে বলেন, ‘বায়ার্নে এই মৌসুমেও দারুণ উজ্জ্বল ছিল এবং আমাদের হয়েও দুর্দান্ত কিছু করছে। ও এখন আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর, ও ভীষণ কার্যকরী। একজন আক্রমণভাগের খেলোয়াড় হওয়া সত্ত্বেও রক্ষণে সাহায্য করার মতো কঠোর পরিশ্রমের এক অসাধারণ ক্ষমতা আছে ওর।’

উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে ডি-বক্সের ভেতর দুইবার ফিনিশ করার পর, ডান প্রান্ত থেকে কাট-ইন করে যেভাবে বাঁ পায়ের বাঁকানো শটে বল জালে জড়ালেন, তা ছিল দেখার মতো। এই গতিময় দিক পরিবর্তনই এখন ২৪ বছর বয়সী এই তারকার ‘সিগনেচার মুভ’। এই দক্ষতার ওপর ভর করেই চলতি মৌসুমে বায়ার্নের হয়ে ২২টি গোল করেছেন তিনি।

দিদিয়ের দেশম জানান, ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকেই অলিস তার নজর কেড়েছিলেন। সেখানে ফ্রান্স ও আর্সেনালের কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরির অধীনে খেলেছিলেন তিনি। অলিসর ২ গোল ও ৫ অ্যাসিস্টে ভর করেই অলিম্পিকের ফাইনালে উঠেছিল ফ্রান্স। অলিস নিজেও প্যারিস অলিম্পিককে তার জীবনের ‘সেরা ফুটবল অভিজ্ঞতা’ বলে মনে করেন, কারণ এটি মানুষকে তার চেনার সুযোগ করে দিয়েছিল। ফুটবলের দর্শন বদলে দেওয়ার জন্য অঁরির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেও ভোলেননি তিনি।

তবে অনূর্ধ্ব-২৩ থেকে যখন মূল জাতীয় দলে অলিস পা রাখেন, তখন নিজের চেনা রূপ দেখাতে চার-পাঁচটি ম্যাচ সময় লেগেছিল। দেশমের মতে এর কারণ ছিল অলিসর লাজুক স্বভাব, ‘ও খুব বেশি অনুভূতি প্রকাশ করে না। কিছুটা অন্তর্মুখী, তবে ও ভীষণ প্রিয় একটা ছেলে।’ নিজের ষষ্ঠ ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ২০২৫ সালের নেশনস লিগে এক চোখ ধাঁধানো ফ্রি-কিকে প্রথম আন্তর্জাতিক গোল করে নিজের সামর্থ্যরে প্রমাণ দিয়েছিলেন অলিস।

লন্ডনে জন্ম নেওয়া অলিসর পেশাদার ক্যারিয়ারের শুরুটা মোটেও মসৃণ ছিল না। চেলসি এবং ম্যানচেস্টার সিটির একাডেমি থেকে বাদ পড়ার পর তিনি যোগ দেন রিডিং-এ। দ্বিতীয় স্তরের লিগ ‘চ্যাম্পিয়নশিপ’-এ রিডিংয়ের হয়ে খেলার সময় তিনি ইংলিশ ফুটবল লিগের সেরা তরুণ খেলোয়াড় নির্বাচিত হন।

২০২১ সালে তিনি যোগ দেন প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ক্রিস্টাল প্যালেসে। সেখানে তিন মৌসুমের পারফরম্যান্স দেখে বায়ার্ন মিউনিখ তাকে ৬০ মিলিয়ন ইউরোতে (প্রায় ৬৫ মিলিয়ন ডলার) দলে ভেড়ায়। জার্মানির আক্রমণাত্মক ফুটবলের সঙ্গে দ্রুতই মানিয়ে নেন অলিস। চমৎকার পাসিংয়ের সঙ্গে গোল করার ক্ষুধা যোগ করে জার্মান জায়ান্টদের হয়ে ১০৭ ম্যাচে ৪২টি গোল করে ফেলেছেন তিনি।

অলিসর এই অতিমানবীয় পারফরম্যান্স আড়াল করে দিয়েছে কিলিয়ান এমবাপ্পের অফ-ফর্মকে। আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ২-১ গোলে হারের ম্যাচে গোল পাননি, এই ম্যাচেও বেশ কিছু সহজ সুযোগ হাতছাড়া করেছেন এমবাপ্পে।

দেশমও স্বীকার করলেন তা, ‘এটা সত্যি যে ও বেশ কিছু সুযোগ পেয়েছিল কিন্তু কাজে লাগাতে পারেনি।’ তবে এমবাপ্পের ঝুলিতে আছে ৫৬টি আন্তর্জাতিক গোল। অলিভিয়ের জিরুর রেকর্ড ভাঙতে তার প্রয়োজন আর মাত্র ২টি গোল।

এমবাপ্পের ফর্ম নিয়ে দেশম অবশ্য চিন্তিত নন। হাসতে হাসতে ফরাসি কোচ বললেন, ‘ও আমাকে বলেছে ও নাকি আমেরিকার (মূল বিশ্বকাপ) জন্য গোলগুলো জমিয়ে রাখছে। ও যদি সেটাই করে, তবে তো আমার জন্যই ভালো!’ এমবাপ্পে ফর্মে ফিরুন বা না ফিরুন, অলিসর এই উত্থান ফ্রান্সকে জোগাচ্ছে এক নতুন আত্মবিশ্বাস। বিশ্বকাপের মঞ্চে এই শান্ত তরুণই হয়তো হয়ে উঠবেন ফরাসিদের ট্রফি ধরে রাখার সবচেয়ে বড় বাজি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত