ইউরেনিয়ামের সুরক্ষায় বুবি-ট্র্যাপ

আপডেট : ১৪ জুন ২০২৬, ০২:৫০ এএম

দীর্ঘ অচলাবস্থার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্ভাব্য একটি শান্তিচুক্তির দ্বারপ্রান্তে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আজ রবিবারই দুই দেশ চূড়ান্ত ঐকমত্যের পথে পৌঁছতে পারে। শান্তিচুক্তির পথে দীর্ঘ ও জটিল আলোচনায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ ‘এক্স ফ্যাক্টর’ হয়ে উঠেছিল। আরও গভীরভাবে দেখলে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভা-ার দুই দেশের দরকষাকষির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। গতকাল শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, গত কয়েক সপ্তাহে পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রায়-উপযোগী সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের গোপন ভা-ার সিল করে দেওয়ার তৎপরতা ব্যাপক বাড়িয়ে দিয়েছে ইরান। মজুদাগারের সুড়ঙ্গগুলো পরিকল্পিতভাবে ধসিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সেইসঙ্গে প্রবেশ পথগুলোতে বিস্ফোরক মাইন রেখে পাতা হচ্ছে বুবি-ট্র্যাপ। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবগত পাঁচটি সূত্র সিএনএনকে এ খবর জানিয়েছে। ফলে এই ইউরেনিয়ামের মজুদের নাগাল পাওয়া এখন অনেক বেশি কঠিন, বিপজ্জনক ও সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়বে।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ উচ্চসমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। ইরানিদের তৈরি করা এই নতুন প্রতিরক্ষা দুর্গ ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত চুক্তিতে জটিলতার নতুন স্তর যোগ করেছে। তেহরানের সঙ্গে ওই চুক্তির মূল লক্ষ্য এই ইউরেনিয়াম অপসারণ ও ধ্বংস করা। কিন্তু ইরানের এই পদক্ষেপের পর এখন প্রশ্ন হচ্ছে বিপজ্জনক এই সুড়ঙ্গ খুঁড়ে ইউরেনিয়াম বের করার ঝুঁকি আসলে কে নেবে? জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের কূটনৈতিক মিশন এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তাৎক্ষণিকভাবে সিএনএনের প্রশ্নের জবাব দেয়নি হোয়াইট হাউজও। চলমান যুদ্ধ অবসান ও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আলোচনায় এই পরমাণু উপাদান উদ্ধার করাকে আমেরিকার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বারবার উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প।

গত শুক্রবার ট্রাম্প প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, দুই পক্ষই চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। চুক্তি অনুযায়ী ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ওয়াশিংটনের হাতে তুলে দিতে বাধ্য থাকবে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সেই ইউরেনিয়াম ঘটনাস্থলেই ধ্বংস করে ইরান থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও চুক্তি নিয়ে আশার বাণী শুনিয়েছেন। তবে এই সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানি কর্মকর্তারা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্তগুলো এখনো অস্পষ্ট। কয়েকটি সূত্র বলছে, খোদ ইরানিদের জন্যও এখন এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উপাদান বের করা অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হবে। এর জন্য প্রয়োজন হবে ভারী খননযন্ত্র ও মাইন নিষ্ক্রিয়করণ অভিযান যা একাধারে জটিল ও বিপজ্জনক। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অফিস অব নিউক্লিয়ার ম্যাটেরিয়াল রিমুভাল-এর সাবেক প্রধান স্কট রোকার বলেন, এ খবর সত্যি হলে উচ্চসমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধার করার প্রক্রিয়া নিশ্চিতভাবেই জটিল হয়ে পড়বে।

আবার ইরানকে চুক্তি মানার বাধ্যবাধকতা এড়ানোর বড় সুযোগও করে দিতে পারে এই পদক্ষেপ। রোকার বলেন, মধ্যস্থতাকারীরা যদি এমন ‘শর্ত দেন যে যাচাইকরণের জন্য ইরানকে পুরো মজুদ একটি কেন্দ্রীয় স্থানে নিয়ে আসতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত সেই উপাদান সরিয়ে ফেলতে হবে কিংবা তার তেজস্ক্রিয়তা কমাতে’, তবে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ‘সম্পূর্ণ তালিকা সরবরাহ’ এবং তা বের করে আনার পুরো দায়ভার পড়বে তেহরানের ওপর। কিন্তু রোকার সতর্ক করে বলেন এমন পরিস্থিতিতে, আমার আশঙ্কা, ইরান হয়তো দাবি করে বসবে যে উচ্চসমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটা অংশ আর উদ্ধার করা সম্ভব নয়। ফলে ইরান ভবিষ্যতে কোনো একসময় আবারও সেটির নাগাল পাবে না এমন শতভাগ নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারি না। আন্তর্জাতিক মহলের ধারণা, এই ইউরেনিয়াম মজুদের সিংহভাগই রয়েছে মধ্য-ইরানের ইসফাহান পারমাণবিক কেন্দ্রের ধসে যাওয়া সুড়ঙ্গগুলোর ভেতর। বাকি অংশ অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।

মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই পারমাণবিক উপাদান জব্দ করার জন্য বিশেষ সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। তবে শেষ পর্যন্ত ঝুঁকি মাত্রাতিরিক্ত মনে হওয়ায় সেই পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। কিন্তু সেই ঘটনার পর থেকে মাটির নিচে যেখানে তাদের উচ্চসমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পুঁতে রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেই স্থাপনাগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও নিিদ্র করে তুলেছে ইরান। সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে এই ইউরেনিয়াম উদ্ধার করা যে বিপজ্জনক, তা আগেই স্বীকার করেছেন ট্রাম্প। তবে দুটি সূত্র জানিয়েছে, ওই ইউরেনিয়াম ভা-ারকে সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে জনসমক্ষে এনে ট্রাম্প নিজেই হয়তো ইরানকে উসকে দিয়েছেন। ফলে তেহরান নিজেদের সম্পদ আরও কড়া পাহারায় মুড়ে ফেলার তাগিদ পেয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত