ক্রিকেটার নাঈমকে মারধর

এসআই-কনস্টেবল সাসপেন্ড, তদন্ত কমিটি গঠন

আপডেট : ১৪ জুন ২০২৬, ০৩:৫৬ এএম

জাতীয় ক্রিকেট দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে অটোরিকশা থেকে নামিয়ে মারধর করেছে পুলিশ। গত শুক্রবার রাত ১১টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের লালখান বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এরপর তাকে খুলশী থানায় নিয়ে গিয়েও হেনস্তা করা হয়েছে বলে অভিযোগ নাঈমের। এ ঘটনায় খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম ও কনস্টেবল রাশেদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। গতকাল শনিবার দুপুরে নাঈম হাসানের বহদ্দারহাটের ফরিদারপাড়ার বাসায় গিয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান সিএমপি কমিশনার হাসান শওকত আলী।

পুলিশি হেনস্তা ও মারধরের শিকার হওয়ার পর ক্রিকেটার নাঈম হাসান বর্তমানে পৈতৃক বাড়ি ফরিদারপাড়ায় রয়েছেন। শুক্রবার দিবাগত সারা রাত থানায় কাটাতে হয়েছে তাকে। শনিবার ভোররাতের দিকে তিনি বাসায় ফেরেন। এ নিয়ে নিজ বাসায় গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে নাঈম হাসান বলেন, ‘যখন সিএনজি অটোরিকশায় তুলে ফেলে, তখন খুব ভয় পেয়েছিলাম। তখন সেখানে জড়ো হওয়া ১০০-১২০ জনের মতো সমর্থক না থাকলে ঘটনাটি অন্যরকম হতো। বিশেষ করে তাদের ধন্যবাদ দিতে চাই। পুলিশ যখন আমাকে খুলশী থানায় নিয়ে যায়, তখন তাদের অনুরোধ করি, আমার সঙ্গে খুলশী থানায় আসার জন্য। অন্য কিছু ট্রাই করতে পারিনি।’

ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে নাঈম হাসান বলেন, ‘ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, তার জন্য ব্যবস্থা নিয়েছি। ঘটনার দিন পুলিশ সিএনজিতে আমার জিনিসপত্র তল্লাশি করেনি। তারা চাইলে করতে দিতাম। সিএনজিতে যখন তোলা হয়, আমি জানতাম না আমার গলা চেপে ধরবে। তখন আমি ভয় পেয়ে গেছি। পরে থানায় আমার সঙ্গে থাকা পিন পর্যন্ত তাদের দেখিয়েছি।’

বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল ফোন দেওয়ায় কাজ হয়েছে জানিয়ে নাঈম হাসান বলেন, ‘তিনি যখন ওসি সাহেবের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন আমি কথা বলতে চাইলে ওসি আমাকে আঙুল দেখিয়ে চুপ থাকতে বলেন।’ নিজেকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি একটু একা থাকতে চাইছি।’ এর আগে গত শুক্রবার দিবাগত রাতে ঢাকায় প্রিমিয়ার লিগের খেলা শেষে বাসায় ফেরার পথে চট্টগ্রাম নগরের লালখান বাজার এলাকায় অটোরিকশা থেকে নামিয়ে নাঈমকে মারধর ও হেনস্তা করে পুলিশ। পরে তাকে থানায় নিয়ে গিয়েও হেনস্তা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ঘটনার বিবরণ দিয়ে নাঈম হাসান বলেন, ‘শুক্রবার রাত ১১টার দিকে তিনি চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন। তার অটোরিকশাটি ফ্লাইওভার থেকে নামার পর লালখান বাজার এলাকায় পুলিশ সংকেত দেয়। তারা (পুলিশ) আমাকে পরিচয় না দিয়ে গাড়ি থেকে নামতে বলে। অটোচালক থেকে গাড়ির ডকুমেন্ট ছিনিয়ে নেয়। একপর্যায়ে তারা আমার গলা চেপে ধরে জোর করে আরেকটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তোলার চেষ্টা করে।’

এভাবে হেনস্তার কারণ জানতে চাইলে পুলিশ নাঈম হাসানের ওপর আরও ক্ষিপ্ত হয় ওঠে। তিনি বলেন, ‘আমি জানতে চেয়েছিলাম কেন আমাকে এমন করা হচ্ছে। তখন আমাকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়। সেখানে দুজন পুলিশ সদস্য ছিলেন। তাদের সঙ্গে সাদা পাঞ্জাবি পরা আরেকজন ব্যক্তি ছিলেন, তিনিও আমাকে মারধর করেন। আমি বাবাকে ফোন করার চেষ্টা করছিলাম। তখনো আমার গলা চেপে ধরে। আমি চিৎকার করলে আশপাশের শতাধিক মানুষ জড়ো হয়। অনেকেই আমার পরিচয় জানার পর বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করেন।’

নাঈম হাসান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি নিজের পরিচয় দিয়েছি, আইডি কার্ড দেখিয়েছি। তারপরও তারা আমাকে ‘আসামি’ সম্বোধন করে চুপ থাকতে বলেন। পরে জোর করে আরেকটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে থানায় নিয়ে যায়। সেখানে নেওয়ার পর আমাকে নিচের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে বলা হয়। পরে কারও ফোন আসার পর হঠাৎ বদলে যায় পুলিশের আচরণ। এরপর তারা আমাকে বসতে বলেন।’

এদিকে নাঈম হাসানকে মারধর করে থানায় নিয়ে যাওয়া ও হেনস্তার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করেছেন বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল। গতকাল শনিবার দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তামিম ইকবাল জানান, ‘নাঈম হাসানের সঙ্গে গত রাতে যা হয়েছে, কোনোভাবেই তা গ্রহণযোগ্য নয়। রাতে নাঈম আমাকে ফোন করার পর তাৎক্ষণিকভাবে যা যা করা দরকার, করার চেষ্টা করেছি আমি ও অন্য বোর্ড পরিচালকরা। সংশ্লিষ্ট সব জায়গায় আমরা কথা বলছি, নাঈম ও তার পরিবারের সঙ্গেও নিবিড় যোগাযোগ রাখছি। বিসিবির পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে আজকে সকালেই। এরপর আরও যা যা করণীয় আছে, সবকিছু করব আমরা। নাঈম ও সব ক্রিকেটারের পাশে আমরা আছি সবসময়।’

নাঈম হাসানকে মারধরের ঘটনা জানতে ও দুঃখ প্রকাশ করতে তার বাসায় যান সিএমপি কমিশনার। তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় ইতিমধ্যে দুই পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। নাঈম হাসানের কাছ থেকে বিস্তারিত জানার পরপরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ওই ঘটনায় দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের আচরণ পেশাদারসুলভ ছিল না। তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।’

অভিযানে অংশ নেওয়া পুরো টিমের বিরুদ্ধেই বিভাগীয় মামলা করা হবে জানিয়ে সিএমপি কমিশনার বলেন, ‘তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এদিকে গতকাল সকালে নাঈমের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে খুলশি থানায় মামলা করেছেন। এতে এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল ও পুলিশের কথিত সোর্স সোহেলকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় মারধর ও অপহরণ চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। সোর্স সোহেলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সিএমপি কমিশনার বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে জানা গেছে কোনো অবৈধ বস্তু পরিবহনের তথ্যের ভিত্তিতে ওই সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি থামানো হয়েছিল। তবে তথ্যের সত্যতা যাচাই বা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পুলিশকে অবশ্যই পেশাদার আচরণ করতে হয়। সেই জায়গায় ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, সেটিই তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে।’ ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘পুলিশ কখনোই অপেশাদার আচরণকে প্রশ্রয় দেয় না এবং কোনো সদস্যের ব্যক্তিগত অনিয়মের দায় পুলিশ বিভাগ নেবে না।’

নাঈমের বাবা মাহবুব আলম অভিযোগ করে বলেন, ‘পুলিশ আমার ছেলেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে আমি দ্রুত থানায় যাই। ডিউটি অফিসার আমাকে প্রথমে থানাতেই ঢুকতে দেননি। দূরে গিয়ে বসতে বলেন। স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে থানায় ঢুকতে দেওয়া হয়। থানায় এসে পরিচয় দেওয়ার পরও আমার ছেলেকে অপমান করে কথা বলেছেন ওসি। পরে ঢাকা থেকে তামিম ইকবাল, ইসরাফিল খসরুর ফোন পেয়ে পুলিশ নমনীয় হয় এবং ভুল স্বীকার করে। জড়িত পুলিশ সদস্যদের শাস্তি চাই।’

পুলিশের এমন আচরণে নাঈম হতবাক ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন জানিয়ে তার শ্যালক আবেশ খান জানান, পুলিশকে ক্রিকেটার পরিচয় দেওয়া হয়েছে। পুলিশকে আইডি কার্ডও দেখিয়েছে। সবকিছু দেখানোর পরেও সিএনজিওয়ালার কথাও পুলিশ শুনতে নারাজ। নাঈমকে গল চেপে ধরে হচ্ছে অন্য সিএনজিতে ঢোকানোর চেষ্টা করা হয়েছে। নাঈমকে বহনকারী সিএনজিচালকও শেষ পর্যন্ত থানায় ছিল। পুলিশের সঙ্গে সিভিল পোশাকে থাকা একজন তাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করে। জনগণ তাকে ধাওয়া করেছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত