নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘রিফাইন্ড’ আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গটি। নির্বাচনসংক্রান্ত শর্তাবলি পূরণ করতে পারলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা থাকছে না, সরকারের একজন উপদেষ্টা সম্প্রতি এমন ইঙ্গিত দিলে প্রসঙ্গটি আবারও সামনে আসে।
নির্দলীয় ভিত্তিতে এবার ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সরকারের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের এমন অবস্থানকে রাজনীতিতে ফেরার ক্ষেত্রে একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন আওয়ামী লীগের অনেক নেতা।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অংশ নেওয়ার বিষয়ে দল থেকে কোনো নির্দেশনা এখনো দেওয়া হয়নি। তবে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের অনেকেই ভোটের মাঠে থাকতে আগ্রহী। তারা মনে করেন, এতে তাদের জন্য মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ ঘটবে। দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে আওয়ামী লীগের অন্তত ৩০ জন নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে এমন ধারণা মিলেছে।
সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক জগলু চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের ভাবমূর্তি (ইমেজ) পুনরুদ্ধারই এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতি হওয়া উচিত। স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলের সামনে সে সুযোগ এনে দিয়েছে। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি আছে, এমন নেতাদের সামনের সারিতে এনে রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিতে হবে।’
আওয়ামী লীগের অনেকেই প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এবং একজন নির্বাচন কমিশনারের সাম্প্রতিক বক্তব্যে দলের জন্য এসব সুযোগ দেখছেন। তথ্য উপদেষ্টা গত ৯ জুন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনসংক্রান্ত শর্তাবলি পূরণ করতে পারলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণে সমস্যা নেই।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন বা ইসি। এই নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচনী বিধিমালায়ও কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। দলীয় প্রতীক ছাড়া এ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ইসি সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট বিধিমালা চূড়ান্ত করেছে। এতে প্রার্থী হওয়ার যোগ্য হলে যে কেউ অংশ নেওয়ার সুযোগ আছে।
এই বিধিমালা প্রণয়ন কমিটির সভাপতি ছিলেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, কোনো দল বাদ দেওয়ার মতো কোনো বিধান আচরণবিধিতে রাখা হয়নি। প্রার্থী হওয়ার যোগ্য যে কেউ অংশ নিতে পারবেন নির্বাচনে।
এই বিধিমালা পাস হলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগসহ যেকোনো দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকরা নির্বাচনী কর্মকা-ে অংশ নিতে পারবেন, এমনটা মনে করেন দলের নেতারা।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের উপদেষ্টা ও নির্বাচন কমিশনের প্রায় একই রকম অবস্থানের কারণে রাজনৈতিক মহলে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, এই নির্বাচনকে ঘিরে ‘রিফাইন্ড’ আওয়ামী লীগ তৈরির জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে সরকার। নির্দলীয় এ নির্বাচনে দলটির যারা অংশ নেবেন এবং বিজয়ী হবেন, তাদের নিয়ে ‘রিফাইন্ড’ আওয়ামী লীগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই ভারত ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেন।
জগলু চৌধুরীর মতো করে আওয়ামী লীগের বড় অংশ মনে করেন, বাজে ভাবমূর্তির (ইমেজ) কারণে ক্ষমতা হারাতে হয়েছে আওয়ামী লীগকে। তাই ইমেজ পুনরুদ্ধার করেই রাজনীতিতে ফিরতে হবে ‘ফ্যাসিস্ট’ তকমা লাগা দলটিকে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে দলের পাশাপাশি অনেক নেতার ইমেজের পরীক্ষাও নেওয়া হয়ে যাবে। একই সঙ্গে প্রান্তিক পর্যায় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দল সুসংগঠিত হওয়ারও সুযোগ পাবে।
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল বাছিদ সজলু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইমেজ ভালো, এমন নেতাদের দিয়ে শুরু করলে দল দ্রুত রাজনীতি হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে পারবে। সেই সুযোগ সৃষ্টি করবে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন।
মাঠপর্যায়ের অনেক নেতা মনে করেন, রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়াতে হলে এবং মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হতে গেলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ আওয়ামী লীগকে নিতেই হবে। এক্ষেত্রে বিকল্প ভাবা যাবে না। ভালো ভাবমূর্তি আছে, এমন নেতাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য সিগন্যাল দেওয়া হলে, এই প্রক্রিয়ায় দক্ষ সংগঠকদের যুক্ত করা হলে দলের মাঠে ফেরার রাজনীতি সহজ হয়ে যাবে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকে মনে করেন, ২০১৮ সালের পর সারা দেশে আওয়ামী লীগের আদর্শের বাইরের অনেকে দলে নেতা হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। প্রধানত তাদের কারণে দলের ভাবমূর্তির সংকট তৈরি হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অন্যায়-অনিয়মের কোনো অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করেনি আওয়ামী লীগ। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের জবাবদিহি করা হয়নি। বরং যার বিরুদ্ধে বেশি অভিযোগ ছিল, তিনি তত বেশি ক্ষমতাশালী থেকেছেন। ফলে টাকা ছাড়া কিছুই করে না আওয়ামী লীগ, এমন অভিযোগ টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীও এমন অভিযোগ করেছেন।
দলের সম্পাদকমন্ডলীর এক সদস্য বলেন, আওয়ামী লীগ মানেই লুটপাটকারী, দুর্নীতিবাজ, টেন্ডারবাজ ও চাঁদাবাজ এ অভিযোগগুলো আকাশে-বাতাসে ঘুরতে ঘুরতে এক সময়ে সাধারণ মানুষের কাছে সত্যে রূপ নিয়েছে। এসব অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক এক সভাপতি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন কলকাতা, দিল্লি, ইউরোপ ও আমেরিকা ছেড়ে দেশে ফিরে আসতে হবে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বকে। দেশের বাইরে বসে নয়, ঢাকাকেন্দ্রিক রাজনীতি শুরু করতে হবে।
আওয়ামী লীগের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্স ইনস্টিটিউশনে (সিআরআই) গবেষণার কাজ করেন তরুণ এক নেতা। তিনি বলেন, কাউকে বাদ দিয়ে নয়, ইমেজ ফেরানোর পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে সবাইকে সঙ্গে রেখে। বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এ উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে বিশৃঙ্খলা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থেকে যাবে।