ইলিশের ডিমের আড়ালের মানুষগুলো

তিন মাসের মৌসুম, বছরের পর বছর সংগ্রাম

আপডেট : ২০ জুন ২০২৬, ০৭:৫৮ এএম

ইলিশের নাম শুনলেই বাঙালির মনে প্রথমেই আসে রুপালি মাছ আর তার স্বাদ। কিন্তু এই ইলিশকে ঘিরে যে আরেকটি ছোট্ট জগৎ রয়েছে, যেখানে মৌসুমজুড়ে প্রতিদিন শত শত কেজি ডিম আলাদা করা হয়, সেই জগতের মানুষদের কথা খুব কমই জানা হয়।

তিন মাসের একটি মৌসুমে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে ধারালো ছুরি হাতে ইলিশ কাটেন, ডিম আলাদা করেন, লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করেন। হাত কেটে যায়, আঙুলে ক্ষত হয়, জ¦র আসে, তবুও কাজ থেমে থাকে না। কারণ অর্ডার আছে, বাজার আছে আর আছে জীবিকার তাগিদ।

ডিমের জন্যই বিশেষভাবে কেনা হয় ইলিশ

মৌসুম এলেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ডিমভর্তি ইলিশ আসে আড়তগুলোতে। ব্যবসায়ীরা জানান, এ সময়ে মাছ কেনার প্রধান উদ্দেশ্যই থাকে ডিম সংগ্রহ করা।

একজন ব্যবসায়ীর ভাষায়, একটি মৌসুমে দুই থেকে তিনশ মণ পর্যন্ত মাছ কাটা হয়। পুরো কর্মযজ্ঞ চলে প্রায় তিন মাস। বড় আকারের ডিমের দাম প্রতি কেজি তিন হাজার টাকা পর্যন্ত ওঠে, আর অপেক্ষাকৃত ছোট ডিম বিক্রি হয় প্রায় ২ হাজার ৭০০ টাকায়।

কখনো কখনো খুচরা বাজারে এর দাম ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

লাভের কেন্দ্রবিন্দু ডিম, মাছ নয়

ব্যবসায়ীদের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই মূল লাভ আসে ডিম থেকে, মাছ থেকে নয়।

এক মণ মাছ যদি ৪০ হাজার টাকায় কেনা হয়, তাহলে সেই মাছের মাংস বিক্রি হতে পারে প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায়। কিন্তু একই মাছের ডিম কয়েক হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। ফলে অনেক সময় মাছের অংশে লোকসান হলেও ডিম থেকেই লাভ উঠে আসে।

এ কারণে ডিম সংগ্রহের জন্য আলাদা দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। ডিম বের করার পর মাছ পরিষ্কার করে ধোয়া হয়, লবণ মাখানো হয় এবং সংরক্ষণের জন্য প্রস্তুত করা হয়।

কারা কেনেন এই ডিম?

সব ক্রেতা একই ধরনের নন। কেউ নিজের খাওয়ার জন্য কেনেন, কেউ ব্যবসার জন্য।

ব্যবসায়ীরা জানান, সামর্থ্যবান ক্রেতারা উচ্চমূল্য দিয়েও ইলিশের ডিম কিনে থাকেন। আবার বাজারদর কমে গেলে অনেক ডিম কারখানা বা প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানে চলে যায়। সেখান থেকে এগুলো বিভিন্নভাবে সংরক্ষণ ও বিপণন করা হয়।

দেশের বাইরেও ইলিশের ডিমের চাহিদা রয়েছে। যেসব দেশে বাঙালি বা মাছপ্রিয় জনগোষ্ঠী রয়েছে, সেসব বাজারেও এই পণ্য পৌঁছে যায়।

লবণই প্রধান সংরক্ষণ উপাদান

ইলিশের ডিম ও মাছ সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয় খুব সাধারণ একটি উপাদান লবণ।

ব্যবসায়ীরা জানান, অন্য কোনো রাসায়নিক বা ওষুধের প্রয়োজন হয় না। সঠিকভাবে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করলে মাছ এক বছর, দুই বছর, এমনকি আরও দীর্ঘ সময় ভালো থাকে।

সংরক্ষণের পুরো প্রক্রিয়ায় বারবার লবণ দেওয়া, বরফ ব্যবহার, বাজারে নিয়ে যাওয়া এবং বিক্রির মতো নানা ধাপ রয়েছে। তাদের ভাষায়, নোনা মাছের ব্যবসা সহজ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক শ্রম ও ধৈর্য।

ছুরির আঘাত, জ¦র আর তবু কাজ

এই পেশার সঙ্গে জড়িত মানুষের জীবনে রয়েছে নানান শারীরিক ঝুঁকি।

মাছ কাটতে গিয়ে হাত কেটে যাওয়া যেন স্বাভাবিক ঘটনা। কখনো ব্লেডের গভীর আঘাতে আঙুল

ফুলে যায়, সংক্রমণ হয়, এমনকি চিকিৎসার

প্রয়োজনও পড়ে।

একজন কর্মীর হাতে তখনো পুরনো ক্ষতের চিহ্ন। তিনি বলছিলেন, শরীরে জ¦র থাকলেও কাজ বন্ধ রাখা যায় না। কারণ অর্ডার থাকলে মাছ নিতে হবে, মাছ এলে কাটতেই হবে।

এই মানুষগুলোর কাছে কাজ মানেই শুধু জীবিকা নয়, পরিবারের দায়িত্বও।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই পেশা

কেউ কেউ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে মাছের জগতের সঙ্গে যুক্ত।

প্রায় ৩৫ বছর ধরে এই পেশায় থাকা এক ব্যবসায়ী জানালেন, একসময় যে মাছ এক বা দুই টাকায় কেনা যেত, এখন তার দাম কয়েক হাজার গুণ বেড়েছে। কিন্তু মাছের প্রাচুর্য কমেছে।

তার মতে, আগের মতো আর মাছ পাওয়া যায় না। দেশের নদ-নদীতে ইলিশের পরিমাণ কমে যাওয়ায় ব্যবসার ধরনও বদলে গেছে।

বিশাল ডিমেরও দেখা মেলে

অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা জানান, একটি বড় ইলিশ থেকে আধা কেজি পর্যন্ত ডিম পাওয়া সম্ভব। তারা অতীতে এমন মাছ দেখেছেন, যার প্রতিটিতে প্রায় ৫০০ গ্রাম ডিম ছিল। বড় আকারের ডিম পাওয়া গেলে এক মণ মাছ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিম সংগ্রহ করা যায়, যা ব্যবসার হিসাব-নিকাশ বদলে দিতে পারে।

অজানা এক শ্রমজগৎ

ইলিশের ডিম নিয়ে কথা বলতে গেলে সাধারণত আলোচনায় আসে এর স্বাদ বা বাজার দর। কিন্তু এর পেছনে থাকা শ্রমজীবী মানুষগুলোর গল্প খুব কমই সামনে আসে।

প্রতিটি ডিম আলাদা করার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, প্রতিদিনের ঝুঁকি এবং কঠোর পরিশ্রম। বছরের মাত্র কয়েক মাসের মৌসুমকে ঘিরেই তাদের ব্যস্ততা আর সেই সময়টুকুতেই নির্ধারিত হয় পুরো বছরের আয়ের বড় অংশ।

রুপালি ইলিশের মতোই তার ডিমকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক নীরব অর্থনীতি। আর সেই অর্থনীতির কেন্দ্রে রয়েছেন এমন সব মানুষ, যাদের হাতের ক্ষত, পরিশ্রম আর অভিজ্ঞতার ওপরই টিকে আছে এই অজানা জগৎ।

* ছবি তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নেওয়া হয়েছে

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত