কোটি টাকার চুলের ব্যবসা

‘উইগ বাংলাদেশ’-এর মোহাম্মদ আশরাফের পথচলা

আপডেট : ২০ জুন ২০২৬, ০৮:০০ এএম

বিশ্ববাজারে মাত্র ১০০ গ্রাম মানব চুলের দাম ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এই চুলকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে প্রায় ২ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারের একটি বৈশ্বিক শিল্প। অথচ এই বিশাল বাজারের প্রায় ৯৩ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করছে চীন। তবে এই বাস্তবতার মধ্যেও বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা দেখছেন ‘উইগ বাংলাদেশ’-এর স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আশরাফ।

কাঁচামাল রপ্তানির সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রস্তুত পণ্য নিয়ে প্রবেশ করার স্বপ্ন থেকেই তার উদ্যোক্তা যাত্রার শুরু। আজ তার প্রতিষ্ঠানের তৈরি উইগ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছাচ্ছে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে অসংখ্য মানুষের।

কাঁচামাল থেকে তৈরি পণ্যের পথে

শুরুর দিকে মোহাম্মদ আশরাফের ব্যবসা সীমাবদ্ধ ছিল মানব চুল রপ্তানির মধ্যে। বাংলাদেশ থেকে সংগৃহীত চুল পাঠানো হতো চীনের বিভিন্ন কারখানায়। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি উপলব্ধি করেন, শুধু কাঁচামাল রপ্তানি করলে প্রকৃত সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাবে না।

সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় প্রস্তুত উইগ তৈরির উদ্যোগ। নতুন প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং কারিগরি জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে ‘উইগ বাংলাদেশ’।

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। উত্তর আমেরিকার বাজারে এর চাহিদা উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে ব্রাজিল তাদের সবচেয়ে বড় বাজার। এর পরই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

দেড়শ বছরের অভিজ্ঞতার বিপরীতে বাংলাদেশের লড়াই

মোহাম্মদ আশরাফের মতে, চীনের এই শিল্পে অভিজ্ঞতা প্রায় ১৫০ বছরের। সেখানে সরকার-সমর্থিত গবেষণা কেন্দ্রও রয়েছে, যারা শুধু মানব চুল ও উইগ শিল্প নিয়েই কাজ করে।

প্রযুক্তির দিক থেকে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। চীনে উন্নত যন্ত্রপাতি ও ত্রিমাত্রিক প্রিন্টিং প্রযুক্তির সাহায্যে দ্রুত উৎপাদন সম্ভব হলেও বাংলাদেশের অনেক কাজ এখনো হাতে করতে হয়।

তবে তিনি মনে করেন, শ্রমদক্ষতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বড় শক্তি রয়েছে।

দক্ষ হাতই সবচেয়ে বড় সম্পদ

উইগ তৈরির সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো ‘নটিং’। এই প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত যতেœর সঙ্গে চুল বসিয়ে পুরো উইগ তৈরি করা হয়।

মোহাম্মদ আশরাফের ভাষায়, তার প্রতিষ্ঠানের দক্ষ কর্মীরা মাত্র দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ উইগ তৈরি করতে পারেন। এই দক্ষতা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা।

তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা একজন নটিং অপারেটর মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। ক্ষেত্রবিশেষে বাড়িতে বসেও এই কাজ করে আয় করার সুযোগ রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের জন্যও আয়ের সুযোগ

‘উইগ বাংলাদেশ’-এর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে অনেক শিক্ষার্থী খণ্ডকালীন ভিত্তিতে কাজ করেন। স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষে তারা এসে নটিংয়ের কাজে সহায়তা করেন।

তাদের জন্য এটি বাড়তি আয়ের উৎস, আর প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির একটি কার্যকর ব্যবস্থা।

মোহাম্মদ আশরাফ মনে করেন, মাত্র দুই হাজার টাকার প্রাথমিক বিনিয়োগেই কেউ বাড়িতে বসে এই কাজ শুরু করতে পারেন এবং নিয়মিত কাজের মাধ্যমে মাসে অন্তত ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় সম্ভব।

মান নিয়ন্ত্রণে বিশেষ গুরুত্ব

মানব চুল প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে পানির গুণগত মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। এ কারণে তার প্রতিষ্ঠানে রয়েছে বিশেষ ওয়াটার ট্রিটমেন্ট সিস্টেম, যেখানে পানির পিএইচ ও অন্যান্য উপাদান নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

তার মতে, সাধারণ পানির কারণে চুলের স্বাভাবিক মসৃণতা ও গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই রপ্তানিযোগ্য পণ্যের মান ধরে রাখতে নিয়ন্ত্রিত পানি ব্যবহার অপরিহার্য।

বৈচিত্র্যময় পণ্য ও রঙের সমাহার

প্রতিষ্ঠানটিতে বিভিন্ন ধরনের টেক্সচার ও ডিজাইনের উইগ তৈরি করা হয়। স্ট্রেইট, ওয়েভি, কিংকি কার্লসহ নানা ধরনের পণ্য রয়েছে। রঙের ক্ষেত্রেও রয়েছে বৈচিত্র্য। বর্তমানে তাদের সংগ্রহে ৬১টি ভিন্ন রঙের বিকল্প রয়েছে।

বিভিন্ন দেশের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরি করাই তাদের অন্যতম কৌশল।

উৎসব মৌসুমে বাড়ে বিক্রি

আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ উৎসবকে কেন্দ্র করে চাহিদা বেড়ে যায়। উদ্যোক্তার তথ্য অনুযায়ী, বড়দিন উপলক্ষে এক মৌসুমে প্রায় ১৫ কোটি টাকার বিক্রি হয়েছে। এর আগে ঈদের সময়ও প্রায় ১০ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি হয়েছে। এতে স্পষ্ট, বিশ্ববাজারে এই শিল্পের সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে।

নতুন রপ্তানি খাতের সম্ভাবনা

মোহাম্মদ আশরাফ মনে করেন, যথাযথ নীতিগত সহায়তা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং গবেষণায় বিনিয়োগ করা গেলে মানবচুল ও উইগ শিল্প বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতে পরিণত হতে পারে।

তার মতে, বিশ্বের ২ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারের এই বাজারের মাত্র ১ শতাংশ অংশীদারত্ব অর্জন করাও বাংলাদেশের জন্য বড় সাফল্য হবে।

মানুষের দক্ষতা দিয়েই এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন

প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা থাকলেও মানুষের দক্ষতার ওপর ভরসা রাখেন মোহাম্মদ আশরাফ। তার বিশ্বাস, বাংলাদেশের কারিগরদের সূক্ষ্ম কাজের দক্ষতা এবং উদ্যোক্তাদের নতুন কিছু করার আগ্রহই এই শিল্পকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।

কাঁচামাল রপ্তানি থেকে আন্তর্জাতিক মানের প্রস্তুত পণ্য উৎপাদন ‘উইগ বাংলাদেশ’-এর এই যাত্রা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় শিল্পের গল্প, যেখানে কোটি টাকার বাজারের পাশাপাশি রয়েছে কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিশ্ববাজারে নতুন পরিচয় তৈরির সুযোগ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত