ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার দুলারহাট এলাকার নাম এখন অনেকের কাছেই পরিচিত এক নারী উদ্যোক্তার কারণে। মোসাম্মৎ পিংকি শুধু একজন খামারি নন; তিনি একজন বহুমুখী উদ্যোক্তা, প্রশিক্ষক এবং নারী স্বাবলম্বিতার এক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ। হাঁস-মুরগি, মাছ, ফুল, আর্থিক সেবা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির মতো নানা উদ্যোগ নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন আটটি প্রতিষ্ঠান।
তার বিশ্বাস, কাজের কোনো ছোট-বড় নেই। নিজের ভাষায়, ‘কর্মটাই আমার ধর্ম।’
ছোটবেলার জেদ থেকে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা
ছোটবেলা থেকেই নতুন কিছু করার প্রবল ইচ্ছা ছিল তার। কোনো কাজকে অসম্ভব মনে করতেন না। সেই মানসিকতাই তাকে একের পর এক উদ্যোগ নিতে সাহস জুগিয়েছে। পারিবারিক ও সামাজিক নানা বাধা সত্ত্বেও তিনি খামার ব্যবস্থাপনাকে নিজের পেশা হিসেবে বেছে নেন। অনেকেই তাকে বলেছিলেন, হাঁস-মুরগি বা গবাদিপশুর খামার নারীদের জন্য উপযুক্ত কাজ নয়। কিন্তু তিনি সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।
খামার থেকে বহুমুখী ব্যবসা
বর্তমানে তার দুটি বড় খামারে প্রায় ২৪ হাজার মুরগি রয়েছে। পাশাপাশি তিনি মাছ চাষও করছেন। খামারের বিভিন্ন সম্পদকে কাজে লাগিয়ে তিনি একটি সমন্বিত কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। এ ছাড়া ফুল চাষ, শোরুম, হাউজিং প্রকল্প, অফিস পরিচালনা, এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম এবং ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম মিলিয়ে তার প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এখন আট। প্রতিদিন তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঘুরে ঘুরে কাজ তদারকি করেন। তার মতে, শুধু মালিক হলেই হয় না, প্রতিটি কাজের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখতে হয়।
শতাধিক নারী উদ্যোক্তার প্রেরণা
মোসাম্মৎ পিংকি শুধু নিজের সাফল্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি নিয়মিত বিভিন্ন নারীকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন।
তার খামারে প্রতি মাসে বিভিন্ন এলাকা থেকে নারীরা এসে প্রশিক্ষণ নেন। সেলাই, কাপড়ের ব্যবসা, হাঁস-মুরগি পালন কিংবা ছোটখাটো দোকান পরিচালনার মতো বিভিন্ন বিষয়ে তারা উৎসাহ ও পরামর্শ পান।
তার দাবি, এখন পর্যন্ত অন্তত ১০০ থেকে ১৫০ জন নারী তার কাছ থেকে অনুপ্রেরণা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের আয়ের পথ তৈরি করতে
সক্ষম হয়েছেন।
লোকসান থেকে শিক্ষা
উদ্যোক্তা জীবনে তিনি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতিরও মুখোমুখি হয়েছেন। এক সময় ভুল চিকিৎসার কারণে এক রাতেই ১ হাজার ৭০০ মুরগি মারা যায়। আবার ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা অর্জনের পথে প্রায় ১৮ লাখ টাকা লোকসানও হয়েছে।
তবে এসব অভিজ্ঞতাকে তিনি ব্যর্থতা নয়, বরং শিক্ষার অংশ হিসেবেই দেখেন। তার মতে, বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই একজন উদ্যোক্তা সবচেয়ে বেশি শেখেন।
নিজের পরিচয়ে বাঁচার স্বপ্ন
মোসাম্মৎ পিংকির কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন হলো নিজের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। তিনি মনে করেন, একজন নারীরও নিজস্ব পরিচয় থাকা উচিত, যাতে তাকে শুধু বাবার বাড়ি বা শ^শুরবাড়ির পরিচয়ে পরিচিত হতে না হয়। এই আত্মনির্ভরতার দর্শনই তাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছে এবং অন্য নারীদের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।
‘না’ শব্দটি নেই
ফুলের চাষ থেকে শুরু করে খামার ব্যবস্থাপনা যে ক্ষেত্রেই কাজ করেছেন, সেখানে নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করেছেন। তার মতে, ‘পাব না’ বা ‘হবে না’ এ ধরনের শব্দের কোনো জায়গা নেই উদ্যোক্তার অভিধানে।
ব্যবসা করতে হলে সাহস, ধৈর্য এবং দীর্ঘমেয়াদি চিন্তার প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। নারী বা পুরুষ নয়, সফলতার মূল চাবিকাঠি হচ্ছে কাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা।