গল্প সংকটে বলিউড

আপডেট : ২২ জুন ২০২৬, ১২:৫০ এএম

বিশ্বচলচ্চিত্রে হলিউডের পরেই বলিউডের স্থান। তবে এত বড় একটি শিল্প এখন অনেকটাই ফিকে হয়ে আসছে। এক থেকে দেড় দশক আগেও হিন্দি সিনেমায় দেখা গেছে মস-প্রাণ স্পর্শ করা রকমারি সব সিনেমা। কিন্তু তার পর থেকেই বদলে যেতে থাকে বলিউড। যে সিনেমার দাপটে কোণঠাসা হয়ে থাকত দক্ষিণী সিনেমা, সেই জৌলুসও কেড়ে নিয়েছে তামিল, তেলেগুর ছবি। দক্ষিণী সিনেমার বড় বাজেটের ‘পুষ্পা ২’ বা ‘আরআরআর’-এর মতো ভারতীয় ছবিগুলো যখন ইতিহাস ও লোকগাথা নিয়ে নতুনত্বের সন্ধান দিচ্ছে, সেখানে বলিউড এই দৌড়ে অনেকটাই পিছিয়ে পড়ছে। নতুন কোনো পরিবর্তনের হাওয়া দেখা যাচ্ছে না বলিউডে। বিশেষ করে সিক্যুয়াল জোয়ারে অতিমাত্রায় গা ভাসানোর দরুন ভীষণ গল্প সংকটে পড়ছে বিশ্বের দ্বিতীয় এই ফিল্ম ইন্ড্রাস্টি। উচ্চপারিশ্রমিক ও বাজেট বিপর্যয়ে বড় তারকাদের পারিশ্রমিক সিনেমার বাজেটের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ে নিচ্ছে, যার ফলে নির্মাণ ও গল্পের গুণগত মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

সিনে বিশ্লেষকদের মতে, বলিউড বর্তমানে একটি তীব্র গল্প বা চিত্রনাট্য সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পুরনো গল্পের পুনরাবৃত্তি, দক্ষিণী ছবির অন্ধ অনুকরণ এবং তারকাদের আকাশচুম্বী পারিশ্রমিকের কারণে মৌলিক ও মানসম্মত চলচ্চিত্রের সংখ্যা কমে গেছে। ফলস্বরূপ, দর্শকরা নতুন এবং বাস্তবসম্মত কন্টেন্টের দিকে ঝুঁকছেন। এখানে এখন কেবল মৌলিক গল্পের চেয়ে পুরনো সফল ছবির সিক্যুয়াল এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি নির্মাণের দিকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকছে। বক্স অফিসে নিশ্চিত সাফল্যের খোঁজে এবং দর্শকদের নস্টালজিয়াকে কাজে লাগাতে নির্মাতা ও সুপারস্টাররা এই ‘সেফ গেম’ বা নিরাপদ ফর্মুলা বেছে নিচ্ছেন। অনেকের ধারণা, একদম নতুন কোনো গল্প নিয়ে ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে পুরনো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করলে দর্শক টানা সহজ হচ্ছে।

মুক্তির অপেক্ষায় থাকা আলিয়া ভাট অভিনীত ‘আলফা’র টিজার প্রকাশ্যে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই নতুন করে চর্চায় এসেছে যশ রাজ ফিল্মসের স্পাই ইউনিভার্স। ‘এক থা টাইগার’ থেকে শুরু করে ‘পাঠান’, ‘টাইগার ৩’ এবং ‘ওয়ার’-এর পর এবার আরও একটি অধ্যায়। কিন্তু এই নতুন সংযোজনের উচ্ছ্বাসের মাঝেই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন বারবার ফিরে আসছে আলোচনায় হিন্দি চলচ্চিত্র শিল্প কি ক্রমশ পরিচিত ব্র্যান্ড এবং প্রতিষ্ঠিত চরিত্রের ওপর অতিনির্ভরশীল হয়ে পড়ছে? আর তার অর্থ কি সত্যিই মৌলিক ভাবনার সংকট?

সিক্যুয়াল বা ফ্র্যাঞ্চাইজির ধারণা বলিউডে নতুন নয়। ‘ডন’, ‘ধুম’, ‘হাউসফুল’, ‘হেরা ফেরি’, ‘রেস’ কিংবা ‘গোলমাল’ বহু বছর ধরেই জনপ্রিয় ছবিগুলোকে ঘিরে নতুন অধ্যায় তৈরির চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রবণতা আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বলিউডের ব্যবসায়িক কৌশলের কেন্দ্রে চলে এসেছে। এখন প্রায় প্রতিটি বড় প্রযোজনা সংস্থা নিজেদের ‘ইউনিভার্স’ গড়ে তোলার দিকে ঝুঁকছে। যেন একটি সফল ছবি আর শুধুমাত্র একটি ছবি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ব্র্যান্ড।

সাম্প্রতিক ইতিহাস বলছে, শুধুমাত্র নস্টালজিয়া বা জনপ্রিয় নামের ওপর নির্ভর করে সাফল্য নিশ্চিত করা যায় না। দর্শক আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন এবং বেছে বেছে ছবি দেখছেন। ফলে একটি সিক্যুয়াল যদি নতুন কিছু না দিতে পারে, তাহলে দর্শক তা প্রত্যাখ্যান করতেও দ্বিধা করছেন না।

তবে উদ্বেগের জায়গাটা অন্য জায়গায়। প্রশ্নটা আসলে সিক্যুয়াল বনাম মৌলিক গল্পের লড়াই নয়। বরং উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, নতুন গল্প এবং নতুন নির্মাতাদের জন্য জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে কি না। একটা সময় ‘কাহানি’, ‘কুইন’, ‘পিঙ্ক’, ‘অন্ধাধুন’ বা ‘স্ত্রী’-র মতো ছবিগুলো প্রমাণ করেছিল যে, দর্শক নতুন ভাবনাকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত। কিন্তু বর্তমানে বড় বাজেটের মূলধারার বলিউডে সেই ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম বলেই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত