সংস্কৃতি সচিব কানিজ মওলা স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অর্ধেক শেয়ার রয়েছে এ কোম্পানিতে। খোঁজে খোঁজে কানিজ মওলাকে পাওয়া গেল গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানির (জিটিসিএল) বোর্ডে। তিনি এ কোম্পানির পরিচালক। সংস্কৃতি সচিবের জ্বালানির কোম্পানিতে কাজ কী? কীভাবে তিনি এ কোম্পানিতে যুক্ত হলেন? জানা গেল, তিনি প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি; প্রভাবশালী আমলা। অনেক কিছুই তার জন্য জায়েজ।
তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগে মোট ৩৭টি কোম্পানি রয়েছে; ৩৭টি বোর্ডে ৩০৬ জন বোর্ড সদস্য রয়েছেন। এসব বোর্ডের চেয়ারম্যান ও পরিচালকের ১৬৭টি পদেই আমলারা রয়েছেন। একই ব্যক্তি একাধিক বোর্ডেরও সদস্য। কোনো বোর্ডে বর্তমান আমলাদের পাশাপাশি প্রভাবশালী সাবেক আমলারাও জায়গা পেয়েছেন। একই আমলা একাধিক বোর্ডে যেমন রয়েছেন, আবার কানিজ মওলার মতো আমলা অন্য মন্ত্রণালয় থেকে বিদ্যুৎ-জ্বালানি কোম্পানির বোর্ডের চেয়ারম্যান ও পরিচালক হয়েছেন। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে বেসরকারি কোম্পানিকে টেক্কা দিতে সরকার কোম্পানি গঠন করে থাকে।
কৃষি সচিব ড. রফিকুল ইসলাম মোহাম্মেদও প্রভাবশালী একজন আমলা। তিনি নর্দান ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) চেয়ারম্যান। স্বাভাবিক নিয়মে তার এখন অবসরকালীন ছুটি কাটানোর কথা। কিন্তু সরকার সে ছুটি বাতিল করে তাকে এক বছরের চুক্তিতে কৃষি সচিব হিসেবে নিয়োগ করেছে। এমনটা ভাবা স্বাভাবিক যে, রফিকুল ইসলাম মোহাম্মেদ হয়তো বিদ্যুৎ বিষয়ে বিস্তর জানেন। কিন্তু তার জীবনবৃত্তান্ত ঘেঁটে দেখা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এ সচিব যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন অর্থনীতিতে। উপসচিব থাকাকালে তিনি বগুড়ার ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) ছিলেন। নেসকোর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে এ পরিচয় কাজে লেগেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
দেশের খাদ্য উৎপাদনের পুরো দায়িত্ব কৃষি মন্ত্রণালয়ের। প্রশ্ন উঠতে পারে, সে মন্ত্রণালয়ের প্রধান কার্যনির্বাহীর দায়িত্ব পালনের ফাঁকে তিনি একটি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব কখন, কীভাবে পালন করেন।
শুধু তিনিই নন, স্বরাষ্ট্র থেকে আরও এক ধাপ এগিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের চেয়ারে বসা নাসিমুল গণি দেশের একমাত্র তেল পরিশোধন কোম্পানি ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির (ইআরএল) চেয়ারম্যান। দেশে ব্যবহার্য তেলের এক-চতুর্থাংশের জোগান দেয় ইআরএল। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হকও বিআর পাওয়ার জোন নামের বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানির চেয়ারম্যান। সমালোচকরা অবশ্য বলেন, যত বেশি প্রভাব তত বড় কোম্পানি।
এ কথা খেটে যায় জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের বেলায়। দেশের জ্বালানি সংকট সামাল দেওয়ার মতো গুরু দায়িত্ব যার কাঁধে, তিনিই আবার চারটি কোম্পানির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। দেশের সবচেয়ে বড় তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। তিনি নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি (এনডব্লিউপিজিসিএল), বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি (বিসিপিসিএল) এবং বাংলাদেশ চায়না রিনিউয়েবল এনার্জি কোম্পানিরও (বিসিআরইসিএল) চেয়ারম্যান। তাকে সুপারম্যান বা সুপার কম্পিউটার বললে ভুল বলা হবে না হয়তো।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম পিডিবির বাইরে কতগুলো কোম্পানির পরিচালক তা হয়তো তিনি নিজেও মনে করতে পারবেন না। তিনি শুধু বিদ্যুতের নয়, কোনো কোনো জ্বালানি কোম্পানিরও বোর্ড মেম্বার। তিনি পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি (পিজিসিবি), আশুগঞ্জ পাওয়ার, এনডব্লিউপিজিসিএল, বিসিপিসিএল, কোল পাওয়ার জেনারেশন (সিপিজিসিএল), বাংলাদেশ ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ কোম্পানি (বিআইএফপিসিএল), তিতাস, বাখরাবাদ গ্যাস কোম্পানিরও পরিচালক। সর্বোচ্চ আটটি কোম্পানির পরিচালকের দায়িত্ব পালন করা রেজাউল করিমকেও একজন সুপারম্যান বলা যায়।
বিদ্যুৎ সচিব ফারজানা মমতাজকে জনপ্রশাসনে সংযুক্ত করা হলেও তিনি এখনো রয়েছেন পিজিসিবি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, এলপিজিএল, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি কোম্পানির বোর্ডের চেয়ারম্যানের পদে।
কম যান না পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানও। আব্দুল মান্নান জ্বালানি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব থাকার সময় থেকেই বিভিন্ন বোর্ডে পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। যদিও পিডিবির চেয়ারম্যানের মতো তিনি বিদ্যুৎ কোম্পানির কোনো বোর্ডে নেই। এরপরও তিনি বাপেক্স, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস বিতরণ কোম্পানি (পিজিসিএল), জিটিসিএল, বাখরাবাদ এবং কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানির বোর্ডে রয়েছেন।
বিদ্যুতের ১৫ কোম্পানি : বিদ্যুৎ বিভাগে মোট ১৫টি কোম্পানি রয়েছে। এসব কোম্পানির চারটি যৌথ উদ্যোগে ভারত এবং চীনের রাষ্ট্রীয় কোম্পানির সঙ্গে গঠন করা হয়েছে। এসব কোম্পানিতে ১৩৬ জন বোর্ড সদস্যের ৫৮ জনই প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। সচিব থেকে সিনিয়র সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা রয়েছেন প্রত্যেকটি বোর্ডে। পিজিসিবিতে ৪ জন, আশুগঞ্জে ৪ জন, ইজিসিবিতে ৪ জন, এনডব্লিউপিজিসিএলে ৬ জন, বি আর পাওয়ার জোনে ৫ জন, কোল পাওয়ারে ৫ জন, বিআইএফপিসিএলে ২ জন, ওয়েস্ট জোনে ৪ জন, ডেসকোতে ৬ জন, ডিপিডিসিতে ৭ জন, নেসকোতে ৬ জন, বিসিপিসিএলে একজন, বিসিআরইসিএলে ২ জন, আরপিসিএলে একজন এবং আরএনপিএলে একজন আমলা রয়েছেন।
পেট্রোবাংলার ১৪ কোম্পানি : পেট্রোবাংলার ১৪ কোম্পানিতে ১০৮ বোর্ড সদস্যের ৭০ জনই আমলা। পেট্রোবাংলায় ২ জন, তিতাসে ৫ জন, পিজিসিএলে ৫ জন, সুন্দরবন গ্যাস বিতরণ কোম্পানিতে ৬ জন, বাখরাবাদে ৪ জন, কর্ণফুলীতে ৭ জন, বাপেক্সে ৫ জন, বিজিএফসিএলে ৭ জন, সিলেট গ্যাস ফিল্ডে ৪ জন, জিটিসিএলে ৭ জন, জালালাবাদে ৬ জন, আরপিজিসিএলে ৫ জন, মধ্যপাড়া কঠিন শিলায় ৩ জন এবং বড়পুকুরিয়ায় ৪ জন।
বিপিসির ৮ কোম্পানি : বিপিসির আট কোম্পানির বোর্ড সদস্য ৬২ জনের ৩৯ জনই আমলা। কেউ কেউ সাবেক আমলা। ইআরএলে ৫ জন, পদ্মা অয়েলে ৭ জন, মেঘনায় ৫ জন, যমুনাতে ৩ জন, ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টে ৫ জন, এলপিজিএলে ৭ জন, স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিকে ২ জন এবং পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানিতে ৫ জন আমলা রয়েছেন।
বোর্ডে মধু : কোনো কোনো বোর্ড মিটিংয়ে ৫০০ ডলার পর্যন্ত সম্মানী দেওয়া হয়। তবে বেশিরভাগ বোর্ডে সম্মানী ৬ থেকে ১২ হাজার টাকার মধ্যে। মাসে কোনো বোর্ডে ৪টি পর্যন্ত মিটিং হয়। এ ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ, গাড়ির সুবিধাসহ বৈধভাবে বোর্ড মেম্বাররা অনেক সুবিধা পান। এ ছাড়া অনেকে কোম্পানি থেকে নানা সুবিধা নিয়ে থাকেন। কোম্পানির কেনাকাটা, প্রকল্প বাস্তবায়ন সব কাজেই বোর্ডের অনুমোদন নিতে হয়। সঙ্গত কারণে বোর্ড মেম্বারদের ক্ষমতা দেখানো বা আয়ের অনেক সুযোগ রয়েছে।
কোম্পানি বাইরের মিটিং করতে হয় ঢাকায় : বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের অনেকগুলো কোম্পানির প্রধান কার্যালয় ঢাকার বাইরে। বোর্ড মিটিং করতে ঢাকায় আসতে হয় কর্মকর্তাদের। কারণ ঢাকাতেই থাকেন প্রভাবশালী আমলারা। ঢাকার বাইরের বোর্ড মেম্বারদেরও ঢাকায় আসতে হয়। তারা ঢাকায় না আসতে পারলে অনলাইনে রেখেই বৈঠক সারা হয়।
কোম্পানির কর্মকর্তারা বোর্ডে উপেক্ষিত : কোম্পানিগুলোতে যেসব কর্মকর্তা চাকরি করেন তাদের মধ্যে শুধু ব্যবস্থাপনা পরিচালককেই বোর্ডে রাখা হয়। যদিও একটি বা দুটি কোম্পানির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা গেছে। তবে কোম্পানির আর কাউকে বোর্ডে রাখা হয় না। ব্যবসা একজনের চালান অন্যরা।
সেরাদের সেরা এমন কোম্পানির বোর্ড কেমন হয় : ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কোম্পানির বোর্ড কেমন হয় তা জানার চেষ্টা করেছি আমরা। কোম্পানিগুলোর ওয়েবসাইটে বোর্ড মেম্বারদের তালিকার সঙ্গে তাদের পেশাগত তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, সেসব বোর্ড সরকারি আমলানির্ভর নয়।
ভারতের সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানি ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশনের (এনটিপিসি) ১২ বোর্ড মেম্বারের ৬ জনই কোম্পানির, বাকি ৬ জনের ২ জন সরকার মনোনীত আর ৪ জন স্বাধীন পরিচালক। চীনের নরিনকো গ্রুপের ৯ সদস্যের বোর্ডে ৪ জন কোম্পানির, বাকি সদস্যরা বাইরের। আমেরিকান ইলেকট্রিক পাওয়ারের (এএইপি) ১০ সদস্যের বোর্ডে একজন কোম্পানির চাকুরে, বাকি সবাই প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সাবেক নির্বাহী। বোর্ডে থাকা সারা মার্টিনেজ ২০০৬-২০০৮ সালে মার্কিন শিক্ষা বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি ছিলেন, এখন তিনি সে পদে নেই। ভারত, চীন আমেরিকার কোম্পানির বোর্ডগুলো যেখানে কোম্পানির প্রতিনিধি ও পেশাজীবীদের নিয়ে গঠিত, সেখানে বাংলাদেশের সরকারি কোম্পানির বোর্ডগুলো আমলানির্ভর।
কোম্পানির কর্মকর্তারা যা বলছেন : কোম্পানির বোর্ডের বিষয়ে সরাসরি কোনো কোম্পানির কর্মকর্তা কথা বলতে সম্মত হননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে আমলা নিয়ে বোর্ড গঠন করা হয়। এখন মন্ত্রণালয়ে এমন বোর্ডের সিদ্ধান্তের বিষয়ে কথা বলতে গেলে বলা হয়, উনি বিদ্যুৎ-জ্বালানির কী বোঝেন! বোর্ডগুলো দ্রুত কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেও পারে না। পেশাজীবীর বদলে কর্মকর্তাকেন্দ্রিক হওয়ায় অনেক প্রস্তাব উত্থাপনের পর বলা হয়, ‘এটা পরে ওঠান।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘ওসির কাজ তো ডিসিকে দিয়ে হয় না। আমলাদের কাজ ব্যবসা করা নয়। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যবসায়ী বানানো হয়েছে।’ বোর্ডগুলো ভেঙে করপোরেট ধারায় গড়ে তোলা উচিত বলে তিনি মনে করেন।