জুলাই চেতনা বিক্রি ও ঋণ খেলাপি নিয়ে আলোচনা

আপডেট : ২৬ জুন ২০২৬, ০৩:২৮ এএম

জুলাই আন্দোলনকে পুঁজি করে ব্যবসা ও খেলাপি ঋণের কারণে দেশের অর্থনীতির দুরবস্থা নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে ময়মনসিংহ-১০ আসনের (বিএনপি দলীয়) সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান বলেছেন, ‘যারা জুলাই চেতনা বিক্রি করেন, তাদের অনেকেই আগে রিকশায় চড়তেন, এখন প্রাডোতে চড়েন।’ তিনি বলেন, ‘যারা জুলাই চেতনা বিক্রি করেন মাননীয় স্পিকার, আমি অনুরোধ করব- উনারা আগে কীসে চড়তেন, এখন কীসে চড়েন? কোন বাসায় থাকেন উনারা, মাঝেমধ্যে লাইভ করেন, কোন বাসায় থাকেন একটু লাইভ করলে এই জাতি দেখত। উনারা আগে কোথায় ছিলেন? এখন পরিবর্তনটা কী রকম হয়েছে?’

কটাক্ষের জবাবে হাসনাত আব্দুল্লাহর পদত্যাগের চ্যালেঞ্জ : জাতীয় সংসদে জুলাই বিপ্লব-সংশ্লিষ্টদের ইঙ্গিত করে দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আজকে এই সংসদে আমাদের উদ্দেশ করে বলা হয়েছে যে, আমরা নাকি আগে রিকশায় চড়তাম, আর এখন গাড়িতে চড়ি।’ সরকারের দায়িত্বশীল জায়গা থেকে এভাবে ঢালাও অভিযোগ বা ‘এলিগেশন’ না দিয়ে তিনি সরাসরি তদন্তের আহ্বান জানান। হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা ডিজিএফআই, এনএসআই ও পুলিশসহ সব গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে তদন্ত করিয়ে যদি আমাদের বিরুদ্ধে এক টাকার দুর্নীতি বা কোনো অসদুপায়ের প্রমাণ মেলানো যায়, তবে সংসদ থেকে ইস্তফা দেব।’

ঋণখেলাপির কারণে ব্যাংকিং খাত সম্পূর্ণ বেহাল : আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে সংসদ সদস্য (বিএনপি) রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘আমি ৩৫টি দেশে কাজ করেছি। আমরা মোট ঋণের ৬ শতাংশ খেলাপি হলে ঘাবড়ে যেতাম। কিন্তু সেখানে বাংলাদেশ ৬১ শতাংশ। এতে ব্যাংকিং খাত সম্পূর্ণভাবে বেহাল। ব্যাংকের বিষয়ে কড়া পদক্ষেপ না নিলে অর্থনৈতিক অগ্রগতি আশা করাটা ভুল। আমাদের ব্যাংকিং দক্ষতা বাড়াতে হবে। এ সময় বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের হাততালি দিতে দেখা যায়।

সরকারের ৪ মাসে ঋণ বেড়েছে আরও ১ লাখ কোটি টাকা : প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর মাত্র চার মাসে দেশের ঋণের বোঝা আরও ১ লাখ কোটি টাকার বেশি বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারি, গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে না পারি, সংস্কার বাস্তবায়ন করতে না পারি, আইএমএফের কাছ থেকে আমাদের অর্থমন্ত্রীকে যেমন করে ফিরে আসতে হয়েছিল, সংস্কার বাস্তবায়ন করতে না পারলে সরকারি দলকেও জনগণের কাছ থেকে ফিরে আসতে হবে।’

বাজেট বাস্তবায়নের সময় অবশ্যই জনগণের রায়, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সঠিক পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে আখতার হোসেন বলেন, ‘ব্যাংক খাতে একধরনের অরাজকতা চলছে। শুধু ইসলামী ব্যাংকের বিষয়ে বলব না, আরও পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে, সেগুলো আগের মালিকদের কাছে আবারও বহাল হতে পারে, এমন ধরনের আইনের (ব্যাংক রেজল্যুশন আইন) ১৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ব্যাংকের মালিক যারা আছেন, তারা যদি ৭.৫ শতাংশ টাকা ব্যাক করতে পারেন, তাহলে তাদের কাছে আবারও ব্যাংকের মালিকানা বুঝিয়ে দেওয়া হবে। আমাদের প্রশ্ন হলো, যেসব মালিক এই ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া করেছে, টাকা পাচার করেছে, এই ব্যাংকগুলোকে লুটপাট করেছে, সেই মালিকদের কাছেই ব্যাংকগুলোকে পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়ার ফায়দা কী হতে পারে?

আখতার হোসেন বলেন, এই সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩ লাখ কোটি টাকার মতো। কিন্তু এই কয়েক মাসে এই ঋণের পরিমাণ আরও ১ লাখ কোটি টাকার ওপরে বেড়ে এখন ২৪ লাখ কোটি টাকায় রূপান্তরিত হয়েছে। অর্থাৎ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের চার মাসে আরও ১ লাখ কোটি টাকা ঋণের জালে দেশকে বেঁধে ফেলেছে।

এদিকে আগামী ৫০ বছরেও আওয়ামী লীগের ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য (ময়মনসিংহ-৭) মাহবুবুর রহমান। প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে মাহবুবুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগের উদ্দেশে বলতে চাই, আওয়ামী লীগ তিনটা জেনারেশনকে ইনজুরড করেছে। একটা হচ্ছে স্কুল, আরেকটা কলেজ, আরেকটা ইউনিভার্সিটি। এটা হলো নিরাপদ সড়ক, কোটা আন্দোলন; পরে হাসিনার খেদাও আন্দোলন। এই তিনটা জেনারেশন আগ ামী ৫০ বছর জীবিত থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের বোধ হয় ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

এদিকে গতকাল জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম (মাসুদ) একটি বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ‘নিঃসন্দেহে দুর্ভাগ্যজনক’; কিন্তু সে ঘটনায় হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। ওই হাসপাতালের শিক্ষার্থী, বিশেষ করে, বিদেশি শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তার কথাও সংসদে তোলেন তিনি। তিনি বলেন, প্রায় ২৪৭ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ‘দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন’; সচিব, মহাপরিচালক বা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাচ্ছেন না।

গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য জামায়াতে ইসলামীর সালাহউদ্দিন আইউবী বলেন, ‘এটা শুধু গরিব মারার বাজেট নয়। গরিবকে হয়রানির বাজেট।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত