প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্বের ৩৮ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) থেকে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধনীদের তুলনায় নিম্নআয়ের মানুষের ওপর তুলনামূলক বেশি চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, ভ্যাটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কর ন্যায্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগের বিষয়। কারণ ভোগভিত্তিক এ কর নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর ওপর তুলনামূলক বেশি চাপ সৃষ্টি করে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা না থাকলে এই চাপ আরও বাড়তে পারে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে ‘জাতীয় বাজেটে কর ন্যায্যতা : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব প্রস্তাবনার ওপর পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক সংলাপে এ পর্যালোচনা তুলে ধরে সিপিডি। সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের সঞ্চালনায় সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী তামিম আহমেদ। এ সময় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য (করনীতি) ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী ও সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রাহমান, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমানসহ অন্যরা বক্তব্য রাখেন।
মূল প্রবন্ধে তামিম আহমেদ বলেন, ভ্যাটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কর ন্যায্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগের বিষয়। কারণ ভোগভিত্তিক এ কর নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর ওপর তুলনামূলক বেশি চাপ সৃষ্টি করে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা না থাকলে এই চাপ আরও বাড়তে পারে।
সিপিডির মতে, একটি আদর্শ ও প্রগতিশীল করব্যবস্থায় সরকারের রাজস্বের প্রধান অংশ আসা উচিত প্রত্যক্ষ কর থেকে, যেমন ব্যক্তিগত আয়কর ও করপোরেট কর। কারণ এ ধরনের কর ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আয় ও কর দেওয়ার সক্ষমতার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা যায়। এনবিআরের মোট কর আদায়ের প্রায় ৬৫ থেকে ৬৬ শতাংশ এখনো ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্কের মতো পরোক্ষ কর থেকে আসে। ফলে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে তুলনামূলক বেশি আর্থিক বোঝা বহন করতে হয়।
ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, ন্যায়সঙ্গত করব্যবস্থা ছাড়া টেকসই রাজস্ব আহরণ সম্ভব নয়। পর্যাপ্ত রাজস্ব সংগ্রহ করতে না পারলে রাষ্ট্রের পক্ষে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং প্রয়োজনীয় জনসেবা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। কর ন্যায্যতা ও রাজস্ব আহরণ একে অপরের পরিপূরক। জনগণের আস্থা অর্জন করে কর আদায় বাড়াতে হলে করব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক করতে হবে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বলেন, কর ন্যায্যতা শুধু বাজেট ঘোষণার সময় আলোচনার বিষয় হতে পারে না। বাজেট প্রণয়নের আগে ও পরে অংশীজনদের মতামত বিবেচনায় নেওয়ার ধারাবাহিক প্রক্রিয়া থাকতে হবে। করব্যবস্থা ন্যায়সঙ্গত করতে হলে ব্যবসায়ী, করদাতা, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে পৌঁছানো উচিত। কিন্তু বাজেটের বিভিন্ন প্রস্তাব অনেক সময় একশ্রেণির জন্য সুবিধাজনক হলেও অন্য শ্রেণির জন্য বৈষম্য তৈরি করে। তাই কর ন্যায্যতার বিষয়টি শুধু কর কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থা ও সম্পদের বণ্টনের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।